বহু নাটকীয়তার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে অনুমোদন পাওয়া চীনের দুই প্রতিষ্ঠান শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়াম থেকে এখন আলোকরশ্মি দেখতে পাচ্ছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন।

এ বিষয়ে খায়রুল বলেন, চীনকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী নেয়ায় বাজার কী সুবিধা পেল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তাদের কাছ থেকে কি স্টোকহোল্ডাররা শুধুমাত্র কয়েক কোটি টাকাই পেল? তবে আমরা এখন কৌশলগত বিনিয়োগকারী থেকে আলোকরশ্মি দেখতে পাচ্ছি।

সোমবার (৭ অক্টোবর) রাতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ‘ভি-নেক্সট’ নামে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডিএসইর এসএমই ওয়েবসাইটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

অথচ গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে যখন শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কনসোর্টিয়ামকে কৌশলগত বিনিয়োগকারীর অনুমোদন চাওয়া হয় তখন প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় বিএসইসি। চীনকে বাদ দিয়ে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী করতে ডিএসইর ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়।

বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একের পর এক সংবাদ প্রকশিত হয়। বিএসইসির এমন ভূমিকায় নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সেই সঙ্গে বিভিন্ন মহল থেকে বিএসইসির ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এ পরিস্থিতিতে বহু নাটকীয়তার পর চীনা কনসোর্টিয়ামকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী করার অনুমোদন দেয় বিএসইসি।

চীনা কনসোর্টিয়ায়ের প্রশংসা করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান খায়রুল হোসেন বলেন, ‘চায়নাকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসাবে নিয়ে আমরা ভাগ্যবান।’


তিনি বলেন, চীন ছোট ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে পৃথিবীতে অন্যতম অর্থনৈতিক উন্নয়নের দেশ হয়েছে। ডিএসইর প্রধান কৌশলগত বিনিয়োগকারী শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জের ভি-নেক্সট প্ল্যাটফর্ম আছে। তাই আমাদেরকে অর্থনীতিতে উন্নয়ন ও জনগণের মধ্যে তা ছড়িয়ে দিতে ছোট ও মাঝারি শিল্পের ওপর দাঁড়াতে হবে।

খায়রুল বলেন, যেসব ছোট ও মাঝারি শিল্প হবে, সেগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে যাবে। আমরা চলতি মূলধনের জন্য ব্যাংক ঋণ নির্ভরশীলতা বাড়াতে পারি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের ক্ষেত্রে শেয়ারবাজারে আসতে হবে। তারই ধারাবাহিকতায় ডিএসই এসএমই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া ও জাপান বৃহৎ শিল্প দিয়ে শুরু হয়েছিল। একমাত্র চীন ছোট ও মাঝারি শিল্প দিয়ে শুরু করেছিল। আমাদের দেশে যেখানে ৬৫ শতাংশ মানুষ ৩৫ বছরের নিচে, সেখানে ছোট ও মাঝারি শিল্পের উপর নির্ভর করে এগোতে হবে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও কর্মসংস্থান হবে। এ শিল্পকে সচল করতে পারলে ২০৪১ সালের আগেই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে।

ডিএসইর ভি-নেক্সট প্ল্যাটফর্মের বিষয়ে খায়রুল বলেন, ভি-নেক্সটের মাধ্যমে চীন থেকে শুরু করে সব দেশ থেকেই বিনিয়োগ আসবে। একইসঙ্গে কর্পোরেট সাংস্কৃতি আসবে। এছাড়া আমাদের দেশে চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, কস্ট ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্টেন্ট, চার্টার্ড সেক্রটারিজসহ যেসব দক্ষ জনবল গড়ে উঠবে, তাতে করে ভবিষ্যৎ শেয়ারবাজার নিয়ে আমি আশাবাদী। ডিএসই যে এসএমই বোর্ড তৈরি করেছে, এগুলোর কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানে পরিচালনা করে উদ্যোক্তাদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। ইস্যু ম্যানেজারদেরকেও তাদের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক মানে পরিচালনা করতে হবে।

ডিএসইকে উদ্দেশ্য করে বিএসইসির চেয়ারম্যান বলেন, ভি-নেক্সট মার্কেটটি যেন হুজুগের কারণে নষ্ট না হয়। আমার অনুরোধ থাকবে প্রথমদিকে থেকেই আপনারা সচেতন থাকবেন। একইসঙ্গে আশা করব, ডিএসই শিগগির অটোমেটিক ট্রেডিং বোর্ড চালু করবে। যেখানে ওটিসি মার্কেট থেকে শুরু করে বন্ড মার্কেটের ট্রেডিং শুরু হবে। এর মাধ্যমে শেয়ারবাজার আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের ও উন্নত দেশের সমতুল্য হবে।

তিনি বলেন, ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রীর আইটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় আমাকে ডেকে বললেন, আইটি খাতের কোম্পানিগুলোর জন্য ৫০ কিংবা ১০০ কোটি টাকার দরকার নেই, ৫-১০ কোটি টাকা সংগ্রহে বিএসইসি কাজ করতে পারে। তখনই আমরা মাত্র ৬ মাসে একটি আইন প্রণয়ন করি। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালে কোয়ালিফাইড ইনভেস্টর রুলস করি। যাতে করে স্মল প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। পরবর্তীতে ডিএসই সেটা প্রতিষ্ঠা করেছে। আর এটাকে স্বার্থক করতে আজকে এসএমই ও ভি-নেক্সট প্ল্যাটফর্ম উদ্বোধন করেছি। যা অচিরেই শেয়ারবাজারে গভীরতা বাড়াবে।

তিনি আরও বলেন, জিডিপিতে শেয়ারবাজারের অবদান ২০ শতাংশ। তবে আজকের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে শিগগির ১০টি কোম্পানির অনুমোদন অক্টোবরের মধ্যেই দেব। এছাড়া ১৯টি কোম্পানির জন্য চুক্তি বিনিময় হয়েছে। আশা করি শেয়ারবাজারের গভীরতা অনেক বাড়বে। জিডিপিতে শেয়ারবাজারের অবদান বেড়ে যাবে। আর কম লেনদেনের কারণে স্টক ডিলার ও ব্রোকাররা যে কষ্টে আছে, তা অনেকাংশে কমে আসবে।

ডিএসইর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাশেমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন, বিএফপিবি প্রোগ্রামের টিম লিডার ফয়সাল হোসাইন, ডিএসইর ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আব্দুল মতিন পাটোয়ারী প্রমুখ।

শেয়ারবার্তা / মিলন