আর্থিক ভিত্তি, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পরিচালনা পর্ষদের দক্ষতা ও সুনাম দেখেই কোনো কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয় বিভিন্ন মহল থেকে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পক্ষ থেকেও এমন প্রচারণা চালানো হয়। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে মিল পাচ্ছেন না বিনিয়োগকারীরা। পুঁজিবাজারে কারসাজি বা জাঙ্ক নামে পরিচিত শেয়ারেই বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বেশি। এসব শেয়ারেই তারা মুনাফা খোঁজেন বেশি।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারসাজি চক্রের দৌরাত্ম্য সামাল দিতে না পারলে বাজারের জন্য ভালো হবে না। দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাজার ও বিনিয়োগকারীরা। এতে বাজার সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণা বৃদ্ধি পাবে। নতুন বিনিয়োগকারীরা এ বাজারে বিনিয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন।

জানা গেছে, পুঁজিবাজারে বর্তমানে কারসাজি চক্রের কাছে সবচেয়ে আলোচিত শেয়ারের নাম মুন্নু জুট স্ট্যাফলার্স। পতনের বাজারেও কোম্পানিটির শেয়ার অনেকদিন বিক্রেতা সংকটে পড়ে হল্টেড হয়ে যায়। চলতি বছরের জুলাই থেকে কোম্পানিটির শেয়ার দর উঠতে থাকে। ২২ জুলাই শেয়ারটি ৬৮৮ টাকায় হাতবদল হয়েছে। এরপর টানা বেড়ে এখন প্রায় তিনগুণের কাছে চলে গেছে শেয়ারটির দর।

কোম্পানিটির শেয়ার দর আকাশচুম্বী করে কারসাজিকারীরা কয়েক দফায় মোটা অঙ্কের ‘মুনাফা’ তুলে নিয়েছেন। এখন মুনাফার অর্থে শেয়ার কিনছেন; আবার বিক্রি করছেন। শেয়ারটি ক্রয়ে ফেসবুক, টুইটার, হোয়াটস অ্যাপ, ক্লোজগ্রুপ ও মেসেজের মাধ্যমে নানা প্রচারণা চালাচ্ছেন কারসাজি চক্রের সদস্যরা।

এই প্রচারের ফাঁদে পড়ছেন বিনিয়োগকারীরা। লাভের আশায় চড়া দরে শেয়ার কিনছেন তারা। শেয়ারটির এক বিনিয়োগকারী বলেন, ‘ভালো কোম্পানির শেয়ার কিনে কোনো লাভ নেই। ওখানে ব্যবসা হয় না। জাঙ্ক শেয়ারই ভালো। এই শেয়ারটিতে ৩ দিনে প্রায় দুই লাখ টাকা লাভ তুলেছি। এখন আবার কিনছি, শুনছি আরও বাড়বে।’ অন্য একটি শেয়ারে তিন লাখ টাকা লোকসান দেওয়ার কথা জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিনিয়োগকারী জানান, ‘১ লাখ ২০ হাজার টাকা লাভ করেছি মাত্র একটি শেয়ারেই। এখন লোকসান পুষিয়ে নিচ্ছি। যদি লোকসান না দিতাম, তাহলে খারাপ শেয়ারে যেতাম না। উপায় না পেয়ে রিস্ক নিলাম।’


একই অবস্থা স্ট্যাইলক্রাপ্ট, ওয়াটা কেমিক্যালস ও ফরচুন শুজের শেয়ারের ক্ষেত্রে। এরই মধ্যে ওয়াটা কেমিক্যালস পণ্য উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন মেশিনারি বসাতে এলসি খুলেছে মাত্র। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। সূত্র জানিয়েছে, মেশিনারি আমদানি ও স্থাপন শেষে উৎপাদনে যেতে এক বছরের বেশি সময় লাগবে। কিন্তু তার আগে এখন থেকেই শেয়ারটির দর বৃদ্ধি পাচ্ছে অস্বাভাবিকহারে।

ফরচুন শুজ গত এপ্রিলে বিদেশি একটি কোম্পানির কাছে চার লাখ ডলার মূল্যের পণ্য বিক্রিতে চুক্তি করে। কিন্তু চুক্তির খবর আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে আসার আগেই দর বাড়তে শুরু করে শেয়ারটির।

এ বিষয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. রকিবুর রহমান বলেন, ‘লোকসান কাটানোর জন্য খারাপ শেয়ারে বিনিয়োগ করবেন একজন বিনিয়োগকারী, এটা হাস্যকর। আমি তাদের বিনিয়োগকারী বলতে চাই না। অন্যকে ঠকিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে শেয়ার কেনাবেচা করা কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। যৌক্তিক কারণ ছাড়া শেয়ারদর বৃদ্ধিকে উৎসাহ দেওয়া যায় না। অতিমূল্যায়িত শেয়ারগুলোকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদন্তের আওতায় আনতে হবে। এই তৎপরতা বন্ধ করতে না পারলে খারাপ শেয়ারের জন্য ভালো শেয়ার বাজারে আসতে পারবে না।’

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগের চেয়ে বিএসইসির নজরদারি বৃদ্ধি ও এ-সংক্রান্ত বেশ কিছু নতুন নীতিমালা জারি হওয়ার পর সতর্ক অবস্থান থেকে নিজেদের তৎপরতা চালাচ্ছেন কারসাজি চক্রের সদস্যরা। আগে শুধু নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা মিলে এ কাজটি করতেন। বর্তমানে ওই গ্রুপের বাইরেও বিভিন্নভাবে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার কিনতে আগ্রহী করা হচ্ছে। এজন্য চক্রের সদস্যরা প্রতিনিয়ত অল্পসংখ্যক হলেও শেয়ার কিনছেন, আবার বিক্রিও করছেন।

এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা দেখছেন, শেয়ারটির ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে সব সময়ই। ফলে তারাও আগ্রহী হয়ে উঠছেন। গত কয়েক মাস ধরেই চলছে এমন তৎপরতা।
সূত্র জানিয়েছে, আগে স্বল্প সময়ের জন্য শেয়ার কারসাজি হলেও এখন করা হচ্ছে কয়েক মাস সময় নিয়ে। আবার নিজেদের রক্ষায় লাভের টাকার একটি অংশ ওই শেয়ারে বিনিয়োগ করে রাখছেন। এভাবেই অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়ছে অনেক শেয়ার।

শেয়ার কারসাজির এই সংঘবদ্ধ তৎপরতার বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আবু আহমেদ বলেন, পুঁজিবাজারে ভালো মানের শেয়ারের সংখ্যা একেবারেই কম। অনেক ভালো শেয়ারও অবমূল্যায়িত হয়ে পড়ছে অনেক সময়ে। টেলিকম খাতের একটি কোম্পানির শেয়ারদরও কমে যাচ্ছে। এটিও ভালো মানের শেয়ার। এখন বিনিয়োগকারীরা দ্রুত লাভের আশায় কারসাজি চক্রের খপ্পরে পড়ছে। এটি দীর্ঘমেয়াদে বাজারের জন্য ক্ষতিকর। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ভালো শেয়ারের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। তুলনামূলকভাবে কমসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারেই কারসাজি হয়ে থাকে। এজন্য কোম্পানিগুলোর ব্যবসা সম্প্রসারণে রি-আইপি ও রাইট শেয়ার ইস্যু বৃদ্ধিতে উৎসাহ দিতে পারলে ভালো সুফল পাওয়া যেত।

পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারের বড় মূলধনি কোম্পানিগুলোর কোনো একটিতে সমস্যা হলেই তার প্রভাব পুরো বাজারে পড়তে শুরু করে। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজারের বিভিন্ন পর্যায়ের স্টেকহোল্ডারদের উচিত হবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিনিয়োগকারীদের সচেতন করা, প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করা। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে কারসাজি চক্রকে সহযোগিতাকারী ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের কর্মককাণ্ডের প্রতি নজরদারি বৃদ্ধি করলে, তা বাজারের জন্য ইতিবাচক হবে।

শেয়ারবার্তা / হামিদ