সালাহ্উদ্দীন আইয়ুবী: 

ডাচ ডিজিজ কি? ডাচ ডিজিজ রোগটা যেকোনো দেশের জন্য বেশ ভয়ঙ্কর। এই রোগের লক্ষণ ৩টি-

১. দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশ আসবে কোনো একটা নির্দিষ্ট সেক্টর থেকে।

২. জিডিপি বাড়তে থাকবে খুবই দ্রুত। মানুষ তার জীবনযাত্রার মান বাড়াবে। শ্রমিক তার বেতন বাড়াবে আরো সুখে থাকার আশায়। তাদের জীবনযাত্রার সাথে তাল মেলাতে আমদানি নির্ভর অর্থনীতি গড়ে উঠতে থাকবে।

৩. সমাজের ক্ষুদ্র একটা অংশ বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে আর সিংহভাগ মানুষের সম্পদ, উপার্জন কমতে থাকবে।

এই সুখের সংসার ততদিনই টিকে থাকবে, যতদিন একটি নির্দিষ্ট সেক্টর দেশকে ৮০ শতাংশ আর্থিক সাপোর্ট দিতে থাকবে।

উদাহরণ হিসাবে ভেনিজুয়েলার নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। ভেনিজুয়েলায় রপ্তানির ৮০ শতাংশই আসতো তেল রপ্তানি থেকে। কিন্তু ২০১৪ সালে আরব দেশসমূহের একগুঁয়েমিতে যখন বিশ্বব্যাপী তেলের দামে পতন হয়, তখন ভেনিজুয়েলার শক্তিশালী অর্থনীতির ভিত্তি বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।

সরকারি হিসেব বাংলাদেশের জিডিপি গ্রোথ রেট এখন ৮ শতাংশের বেশি। রপ্তানি আয়ের ৮১ শতাংশই আসে গার্মেন্টস সেক্টর থেকে। আমাদের জিডিপির প্রবৃদ্ধিও অন্য যেকোনো দেশের চাইতে বেশি!

এদেশেও ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে। ব্যাংকের টাকা পাচার হয়ে চলে যাচ্ছে বিদেশে। বিনিয়োগও হচ্ছে বাইরের দেশে। আবার ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির তালিকাতেও ১ নম্বরে বাংলাদেশ! সবচেয়ে বেশি আয় বৈষম্যের দেশের তালিকাতেও বাংলাদেশ উপরের দিকে!

অর্থাৎ আমরা অলরেডি ডাচ ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে গেছি! এখন দরকার সামান্য একটা ধাক্কা, তাতেই...

কতদিন চলবে এমন সুদিন? আমাদের এই সেক্টরের ভবিষ্যত কী সুরক্ষিত?

তাহলে আমাদের করনীয় কি?

১. সম্প্রতি সৌদি আরব তেলের উপর অতি নির্ভরতা কাটাতে পর্যটন এর দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি (আরামকো)কে শেয়ার মার্কেটে নিয়ে আসছে। মানে সেই পুরনো প্রথা জনগনের কাছে যাও টাকা নাও

২. নেপাল তার হিমালয়া কেন্ড্রিক পর্যটন ছাড়াও তেল আমদানিতে মনোযোগ দিয়েছে

৩. ভিয়েতনাম নাম অলরেডি হেভি ইন্ডাস্ট্রি তে কনভার্ট করেছে

৪. ইন্ডিয়া তথ্য প্রযুক্তিতে খুবই শক্তিশালী জায়গায় চলে গেছে। তারা ব্যাকআপ তৈরি করেছে।

প্রশ্ন আমাদের কি করনীয়?

টেক্সটাইল সেক্টর আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে নিঃসন্দেহে। এখন আমাদের উচিত এই সেক্টরকে সার্বিকভাবে সার্ভিস দিয়ে শক্তিশালী ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করা।

যেমন এ্যাকোর্ডের চুক্তি মেনে টেক্সটাইল কারখানা গুলোর পরিবেশ উন্নত করা ও সবুজ পরিবেশ বাস্তবায়ন করা।

**আমাদের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে ফার্মা খাত বরাবরই অবহেলিত ছিলো। কিন্তু সেদিন এখন আর নেই। আমরা আজ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই মেডিসিন রপ্তানি করি। সুতরাং এটা হতে পারে টেক্সটাইলের বিকল্প খাত।

**আমাদের স্টিল শিল্প বিশ্ব মানের। আমরা দ্রুত নগরায়ন করছি এবং ২১ সাল নাগাদ আমরা আরো নগরায়ন করবো। সুতরাং আমরা এ শিল্পকে একটি বিকল্প শিল্প হিসাবে বেছে নিতে পারি।

**তথ্য প্রযুক্তিতে আমরা আকষণীয়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের কনটেন্ট আজ বিশ্ব ব্যাপি সমাদৃত ও পুরষ্কৃত হচ্ছে। আমরা এখাতকে প্রনোদনা দিয়ে অনেক সামনে নিয়ে আসতে পারি।
এ লক্ষ্যে কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্ক স্থাপিত হয়েছে।

*জ্বালানি তেলের উপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে আমরা পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সৌর বিদ্যুৎ ও কয়লা নির্ভর বিদ্যুৎ কেন্দ্রকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। এটা একটা চমৎকার উদ্যোগ। এরফলে পেট্রোলিয়াম ও এলপিজি প্রডাক্ট শুধুমাত্র বিদ্যুৎ খাতে ব্যাবহার না করে বহুমুখীকরণ করা সম্ভব হয়েছে। এটাও একটি চমৎকার দিক।

সুতরাং আমাদের কে ডাচ ডিজিজ এড়াতে এখনই ব্যবস্থা গ্রহন করা অতীব জরুরী।


(লেখক একজন এনজিও কর্মকর্তা এবং শেয়ারবাজার বিশ্লেষক)