ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৪ আগস্ট ২০১৮, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৫

কেয়া গ্রুপকে ঋণ দিয়ে উদ্বেগে তিন ব্যাংক

২০১৭ জুলাই ১৩ ০৫:২৭:৪৮
কেয়া গ্রুপকে ঋণ দিয়ে উদ্বেগে তিন ব্যাংক

আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আবদুল খালেক পাঠানের মালিকানাধীন কেয়া গ্রুপ। বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে গ্রুপের ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে থাকা গ্রুপের ১৩৩ কোটি টাকার ঋণ আগেই খেলাপি হয়ে গেছে। খেলাপি হওয়ার পথে রয়েছে গ্রুপটির কাছে থাকা পূবালী ব্যাংকের ৫৬৭ কোটি ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৬৬ কোটি টাকার ঋণও। কেয়া গ্রুপের বিপর্যয়ে ঋণ আদায় নিয়ে উদ্বেগে আছে অর্থায়নকারী এ তিন ব্যাংক। ব্যাংক ৩টির মধ্যে ২টি পুঁজিবাজারে তালিকভুক্ত।

যদিও আবদুল খালেক পাঠান বলছেন, ব্যাংকগুলোর অসহযোগিতার কারণেই আজকের এ অবস্থা। সংকট কাটাতে ব্যাংকগুলো আরো ঋণ দিলে দ্রুতই ঘুরে দাঁড়াবে কেয়া কসমেটিকসসহ গ্রুপের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান।

২০১৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের সঙ্গে কেয়া নিট কম্পোজিট লিমিটেড, কেয়া স্পিনিং মিলস লিমিটেড, কেয়া কটন মিলস লিমিটেডকে একীভূত করা হয়। কোম্পানিটির ২০১৫-১৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেয়া কসমেটিকসের মোট ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ (লং টার্ম লোন) ৮৩৫ কোটি ৯০ লাখ ও স্বল্পমেয়াদি ঋণ (শর্ট টার্ম লোন) ৪২০ কোটি টাকা। তবে কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কোম্পানিটির ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৬৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

কেয়া কসমেটিকসের বড় অংকের ঋণ রয়েছে বেসরকারি পূবালী ব্যাংকে। গত বছরের জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির কাছে পূবালী ব্যাংকের ঋণ ছিল ৩৯৭ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ১৮৫ কোটি ৪৩ লাখ ও স্বল্পমেয়াদি ২১২ কোটি টাকা। তবে পূবালী ব্যাংকের ২০১৬ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেয়া গ্রুপের সবক’টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ ৫৬৭ কোটি টাকা। ব্যাংকের পক্ষ থেকে বারবার তাগাদা দেয়া হলেও কেয়া গ্রুপ ঋণের কিস্তি পরিশোধ করছে না। আগামী রোববার পূবালী ব্যাংকের পর্ষদের বৈঠকে কেয়া গ্রুপের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হবে বলে জানা গেছে।

পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আব্দুল হালিম চৌধুরী বলেন, খেলাপির পর্যায়ে চলে গেলেও পূবালী ব্যাংকের পুরো ঋণ নিরাপদ রয়েছে। কেননা কেয়া কসমেটিকসের ৪২ শতাংশ শেয়ার, গুলশানের একটি বাড়ি, কেয়া গ্রুপের পর্যাপ্ত স্থাবর সম্পত্তি পূবালী ব্যাংকের কাছে জামানত রয়েছে। কেয়া গ্রুপের ঋণের বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত হবে।

তবে পূবালী ব্যাংক কেয়া গ্রুপের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ গ্রুপের কর্ণধার আবদুল খালেক পাঠানের। তিনি বলেন, যে পরিমাণ ঋণের জন্য পূবালী ব্যাংকের কাছে কেয়া গ্রুপ সম্পত্তি জামানত দিয়েছে, সে পরিমাণ ঋণ পূবালী ব্যাংক দেয়নি। ব্যাংকটির কাছে জামানত দেয়া গুলশানের বাড়ির দিকে তাদের নজর ছিল। কেয়া গ্রুপের ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যাংকটি কোনো ধরনের সহযোগিতা করেনি। ২০১০ সালে আমার গার্মেন্টসগুলোয় প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের কাজ করা নিয়ে অন্য শ্রমিকরা আন্দোলনে নামে। ফলে ওই সময় প্রায় ৮০০ কোটি টাকার তৈরি পোশাক কোম্পানির গোডাউনে স্টক হয়ে যায়। পূবালী ব্যাংক সে সময় সহযোগিতা করলে আজকের এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। ব্যাংকটির অসহযোগিতার বিষয়ে সম্প্রতি আমি উকিল নোটিস পাঠিয়েছি। তার উত্তর পেলে পূবালী ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।

কেয়া কসমেটিকসের সঙ্গে একীভূত তিনটি কোম্পানিতে ২৬৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকার মেয়াদি ঋণ রয়েছে বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংকের। এর মধ্যে কেয়া নিট কম্পোজিট লিমিটেডে ৩৫ কোটি ৫৯ লাখ, কেয়া কটন মিলস লিমিটেডে ১৮৮ কোটি ৮০ লাখ ও কেয়া স্পিনিং মিলস লিমিটেডে ৪২ কোটি টাকার মেয়াদি ঋণ রয়েছে ব্যাংকটির। বড় অংকের এ ঋণের প্রায় পুরোটাই বর্তমানে খেলাপির পর্যায়ে চলে গেছে বলে জানা গেছে।

বিষয়টি নিয়ে ব্যাংকের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে কেয়া গ্রুপের কর্ণধার আবদুল খালেক পাঠান এ বিষয়ে বলেন, ন্যাশনাল ব্যাংক কেয়া গ্রুপকে অসহযোগিতা করার কারণে ঋণটি আটকে গেছে। বিষয়টি নিয়ে আমি ন্যাশনাল ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করেছি।

কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের বড় অংকের ঋণ রয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংকে। দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদে কোম্পানিটির কাছে ওই সময় পর্যন্ত ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ ৪৫৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। আর সাউথইস্ট ব্যাংকের ২০১৬ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর শেষে কেয়া গ্রুপের সবক’টি কোম্পানির কাছে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ ৯১২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ফান্ডেড ঋণ ৩৫১ কোটি ২১ লাখ ও নন-ফান্ডেড ৫৬১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। তবে এ ঋণ নিয়ে তাদের কোনো উদ্বেগ নেই বলে জানিয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংক।

সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল হোসেন বলেন, আমাদের ব্যাংকের সঙ্গে কেয়া গ্রুপের লেনদেন স্বাভাবিক রয়েছে। বড় গ্রাহক হিসেবে আবদুল খালেক পাঠানের ব্যবসায়িক লেনদেন ভালো।

সাউথইস্ট ব্যাংক সম্পর্কেও প্রায় একই বক্তব্য কেয়া গ্রুপের কর্ণধার আবদুল খালেক পাঠানের। তিনি বলেন, সাউথইস্ট ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপকরা খুবই দক্ষ। আমাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক খুবই ভালো। পূবালী ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকের মতো আচরণ সাউথইস্ট ব্যাংক করেনি। ব্যাংকটির ১৫০ কোটি টাকা ঋণে কিছুদিন আগে আমি নতুন কিছু মেশিন আমদানি করেছি। এগুলো পুরো উৎপাদনে গেলে সব ব্যাংকের ঋণ আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই পরিশোধ করে দিতে পারব।

কেয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঋণখেলাপি। ব্যাংকটির শীর্ষ ঋণখেলাপিদের তালিকার দ্বিতীয় স্থানেই রয়েছে কেয়া গ্রুপের কর্ণধার আবদুল খালেক পাঠানের নাম। ব্যাংকটির কারওয়ান বাজার শাখা থেকে ১৩৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দেননি কেয়া গ্রুপের স্বত্বাধিকারী। বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েও অর্থ আদায় করতে না পেরে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে কৃষি ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ১৩৪ কোটি ৫৭ লাখ টাকা আদায়ে উচ্চ আদালতে দায়েরকৃত রিট (রিট নং-৬৭৮৯/১৩) চলমান রয়েছে। কৃষি ব্যাংকের এ ঋণ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকায় উঠে এসেছে আবদুল খালেক পাঠানের মালিকানাধীন কেয়া ইয়ার্ন লিমিটেডের নাম।

কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ব্যাংকের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিয়ে কেয়া ইয়ার্ন মিলসের স্বত্বাধিকারী আবদুল খালেক পাঠানের সঙ্গে আমরা বৈঠক করেছি। তিনি তার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে নতুন করে ২৫০ কোটি টাকার সিন্ডিকেশন ঋণ চেয়েছেন। আমি নিজে তার প্রতিষ্ঠানগুলো দেখে এসেছি। আমি চাই না কেয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যাক। কারণ ওই প্রতিষ্ঠানগুলোয় হাজার হাজার শ্রমিক কাজ করছে। অন্যান্য ব্যাংক এগিয়ে এলে কৃষি ব্যাংক এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

তবে কৃষি ব্যাংকের অসযোগিতার কারণেই ঋণটি খেলাপি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আবদুল খালেক পাঠান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের আওতায় ঋণটি পুনর্গঠন করার আবেদন জানানো হলেও কৃষি ব্যাংক পুনর্গঠন করেনি। ফলে ঋণটি খেলাপি হয়ে গেছে। ব্যাংকের সহযোগিতা ছাড়া বিদ্যমান সংকট থেকে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

কেয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠান কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের ঋণ রয়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া, স্ট্যান্ডার্ড, ডাচ্-বাংলা, সোস্যাল ইসলামী, প্রিমিয়ার, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল ও রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের। গত বছরের জুন শেষে কোম্পানিটির কাছে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ঋণের স্থিতি ছিল ৭৫ কোটি ১১ লাখ টাকা। একই সময়ে ব্যাংক এশিয়ার ১৫ কোটি ৬১ লাখ, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ১৩ কোটি ৬০ লাখ, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৮ কোটি ২৩ লাখ ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ২ কোটি ২২ লাখ টাকা ঋণ ছিল কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের কাছে। এছাড়া কোম্পানিটির কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ১৩ কোটি টাকা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন ক্যাপিটালের ২৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা ঋণ ছিল।

উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালে খালেক গার্মেন্টস অ্যান্ড নিটিং নামে কোম্পানি দিয়ে বস্ত্র খাতের ব্যবসায় নামেন আবদুল খালেক। এর পর একে একে প্রতিষ্ঠা করেন কেয়া নিট কম্পোজিট লিমিটেড, কেয়া স্পিনিং মিলস লিমিটেড, কেয়া কটন মিলস লিমিটেড, কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড, কেয়া ইউরোপ ও কেয়া ইউএসএ, কেয়া কসমেটিকস লিমিটেড, কেয়া এগ্রো প্রসেস, কেয়া পরিবহন, পলি অ্যাডভারটাইজিং ও কেয়া ডেভেলপারস লিমিটেড। এর মধ্যে কেয়া কসমেটিকস ২০০১ সালে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত হয়।

শেয়ারবার্তা/শহিদুল ইসলাম

অনুসন্ধানী রিপোর্ট এর সর্বশেষ খবর

উপরে