ঢাকা, সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬

বিনিয়োগকারীদের ফের পথে বসানোর ষড়যন্ত্রে মুন্নু গ্রুপের শেয়ার

২০১৯ সেপ্টেম্বর ০২ ২২:৫২:৫৬
বিনিয়োগকারীদের ফের পথে বসানোর ষড়যন্ত্রে মুন্নু গ্রুপের শেয়ার

পুঁজিাবাজরের একটি কারসাজি চক্র মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে মুন্নু স্ট্যাফলার্সের শেয়ার দর ৪০০ টাকা থেকে ৫৬৩৪ টাকায় এবং মুন্নু সিরামিকের শেয়ার দর ৪০ টাকা থেকে ৪৪১ টাকায় তুলেছিল। কোম্পানি দুটির শেয়ার দরে উল্লম্ফন ঘটিয়ে সেই চক্রটি পুঁজিবাজার থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। অন্যদিকে চড়া দরে কোম্পানি দুটির শেয়ার কিনে পুঁজিহারা হয়ে পথে বসেছিল হাজার হাজার বিনিয়োগকারী। এরপর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) তদন্ত কমিটি গঠন করে কারসাজিকারীদের শাস্তিও দিয়েছিল। কিন্তু শাস্তির মাত্রা কেবল লোক দেখানো হয়েছিল বিধায় কারসাজিকারীদের দমানো যায়নি। বরং তারা আরও বেসামাল হয়ে নবরূপে আর্ভিভূত হচ্ছে। কোম্পানি দুটির শেয়ার নিয়ে ফের অসাধু চক্রটি নতুন কারসাজির খেলায় মেতে উঠেছে বলে বিনিয়োগকারীরা ও বাজার সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করছেন।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৭ সালের জুলায়ের শেষদিকে মুন্নু স্ট্যাফলার্সের শেয়ার দর ছিল ৪০০ টাকার নিচে এবং মুন্নু সিরামিকের শেয়ার দর ছিল ৪০ টাকার নিচে। ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বর মুন্নু স্ট্যাফলার্সের দর উঠে ৫৬৩৪ টাকায় এবং ২০১৯ সালের ৩ মার্চ মুন্নু সিরামিকের শেয়ার দর উঠে ৪৪১ টাকায়। এ সময় কোম্পানি দুটির কিছু মূল্য সংবেদনশীল তথ্যও প্রকাশ পায়। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কোম্পানি দুটির ভবিষ্যত স্বপ্নে বিভোর হয়ে শেয়ার দুটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আর এ সুযোগে কারসাজিকারিরা ও মুন্নু কর্তৃপক্ষ তাদের শেয়ার দেদারছে বিক্রি করতে থাকে। তাদের শেয়ারের সেল প্রেসারে কোম্পানি দুটির শেয়ার দরে আচমকা পতন নেমে আসে। অব্যাহত পতনের এক পর্যায়ে গত ২১ জুলাই মু্ন্নু স্ট্যাফলার্সের শেয়ার দর ৬৫০ টাকার নিচে এবং মুন্নু সিরামিকের শেয়ার দর ১২০ টাকার নিচে নেমে যায়।

তবে পরের দিন (২২ জুলাই ২০১৯) থেকে কোম্পানি দুটির শেয়ার দরে আবারও তেজিভাব ফিরে আসে। গত ৬ কার্যদিবসে মুন্নু স্ট্যাফলার্সের দর বেড়েছে ১৩২২.১০ থেকে ১৭০৭.৮০ টাকায়। অর্থাৎ ৬ দিনে কোম্পানিটির দর বেড়েছে ৩৮৫.৭০ টাকা বা ২৯.১৭ শতাংশ। অন্যদিকে, মুন্নু সিরামিকের দর বেড়েছে ২০৬.০৬ টাকা থেকে ২৩৯ টাকায়। অর্থাৎ ৬ দিনে কোম্পানির শেয়ার দর বেড়েছে ১৫.৮২ শতাংশ। কিছুদিন আগেও কোম্পানি দুটির শেয়ার একাধিক কর্মদিবস ক্রেতা সংকটের মুখে পড়েছে। অথচ গত কয়েকদিন মুন্নু স্ট্যাফলার্সের শেয়ার বিক্রেতা সংকটে থেকেছে এবং আজও কোম্পানি দুটির শেয়ার বিক্রেতা সংকটে থেকেছে। অথচ আলোচ্য সময়ে পুঁজিবাজার টানা পতনে ছিল এবং শতাধিক কোম্পানির শেয়ার দর হারিয়েছে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা যায়, গত ২০১৮ সালের ৩০ জুন তারিখে মুন্নু স্ট্যাফলার্সের উদ্যোক্তাদের শেয়ার ছিল ৫৫.৯০ শতাংশ। যা ৩০ জুন ২০১৯ তারিখে কমে দাঁড়ায় ৪২.৯৮ শতাংশে। অর্থাৎ এ সময়ে কোম্পানিটির উদ্যোক্তারা ১২.৯২ শতাংশ শেয়ার বা ২ লাখ ৬৭ হাজার উদ্যোক্তা শেয়ার বাজারে বিক্রি করে দিয়েছে। এতে বাজার দরে উদ্যোক্তারা ৫০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, গত ২০১৮ সালের ৩০ জুন তারিখে মুন্নু সিরামিকের উদ্যোক্তাদের শেয়ার ছিল ৬২.৪০ শতাংশ। যা ৩০ জুন ২০১৯ তারিখে কমে দাঁড়িয়েছে ৫৭.৫৮ শতাংশে। অর্থাৎ এ সময়ে কোম্পানিটির উদ্যোক্তারা ৪.৮২ শতাংশ শেয়ার বা ১৫ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি উদ্যোক্তা শেয়ার বাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে বাজার দরে কোম্পানিটির উদ্যোক্তারা ৫৫ কোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, মুন্নু সিরামিক ও মুন্নু স্ট্যাফলার্সের শেয়ার দর উল্লম্ফনের পেছনে কোম্পানির কিছু পরিচালক ও কর্মকর্তা জড়িত। সাথে রয়েছে ব্যক্তি শ্রেণীর কয়েকজন বড় বিনিয়োগকারী। মুন্নু গ্রুপের উভয় কোম্পানির শেয়ার কারসাজিতে একাধিকবার তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে এবং একটি তদন্ত কমিটির রিপোর্টে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় দোষীদের শাস্তিও হয়েছে। তারা বলছেন, মুন্নু গ্রুপের দুই কোম্পানির মতো পুঁজিবাজারে অন্য কোন কোম্পানির ক্ষেত্রে এতো অধিক সংখ্যক ব্যাক্তি-প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও সতর্ক করা হয়নি।

উল্লেখ্য, গত বছরের ২২ জুন মুন্নু জুট স্টাফলার্স ও মুন্নু সিরামিকসহ আরও কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার কারসাজি তদন্তে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে বিএসইসি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে বিএসইসির ৬৭৬তম কমিশন সভায় কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজের তৎতকালীন এভিপি সাইফুল ইসলামকে ৫০ লাখ টাকা, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট (ভিপি) ও হেড অব ইনভেস্টমেন্ট মো. আব্দুল হালিমকে ২৫ লাখ, ব্যাংকটির ভিপি ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামকে ২৫ লাখ টাকা, বিনিয়োগকারী মো. আলী মনসুরকে ৫০ লাখ টাকা, আবদুল কাউয়ূমকে ৫ লাখ টাকা, মরিয়ম নেছাকে ৫ লাখ টাকা, সাইফ উল্লাহকে ১০ লাখ টাকা, মো. আব্দুস সেলিমকে ৫ লাখ ও মো. জিয়াউল করিমকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে।

এছাড়া, পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোম্পানি সচিব মোস্তফা হেলাল কবীরকে ১০ লাখ টাকা, তার স্ত্রী ফউজিয়া ইয়াসমিনকে ১০ লাখ টাকা ও বিনিয়োগকারী কাজি মো. শাহাদাত হোসেনকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করে বিএসইসি। একই ইস্যুতে পপুলার লাইফ ইন্স্যুরেন্সের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী পরিচালক ইমাদ উদ্দিন আহমেদ প্রিন্স, সহকারী মহাব্যবস্থাপক তাইজুদ্দিন আহমেদ, সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার সৈয়দ মো. আকবরসহ তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারী হাফেজা খাতুন, মবিউর রহমান সরকার ও অহনা কন্সট্রাকশনকে সতর্কপত্র ইস্যু করে।

অন্যদিকে, মুন্নু জুট স্টাফলার্সের শেয়ার লেনদেনে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে কোম্পানিটির ডেপুটি ম্যানেজার আতাউর রহমানকে কড়া সতর্কপত্র জারি করে কমিশন।

বিনিয়োগকারীরা অভিযোগ করছেন, মুন্নু গ্রুপের অসাদু কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কিছু বড় বিনিয়োগকারী যোগসাজশ করে কোম্পানি দুটির শেয়ার দরে বড় উত্থান ঘটিয়ে এর আগে শত শত কোটি টাকা বাজার থেকে হাতিয়ে নিয়েছে। তারাই পরবর্তীতে কোম্পানি দুটির শেয়ার দরে বড় বিপর্যয় ঘটায়। এতে হাজার হাজার বিনিয়োগকারী সর্বশান্ত হয়ে পথে বসে যায়। এখন আবার অসাধু সেই চক্রটিই কোম্পানি দুটির শেয়ার নিয়ে নতুন করে অশুভ ষড়যন্তে মেতে উঠছে। এ চক্রটিই বাজারকে বার বার অস্থির করে তুলছে। বাজারের স্থিতিশীলতা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে অবিলম্বে এই অশুভ চক্রকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান বাজার সংশ্লিষ্টরা।

শেয়ারবার্তা / হামিদ

সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে