ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৩ আশ্বিন ১৪২৬

পুঁজিবাজারে আসা দূর্বল কোম্পানির দায়ভার কার?

২০১৯ জুন ০৪ ১৭:৪২:০৭
পুঁজিবাজারে আসা দূর্বল কোম্পানির দায়ভার কার?

প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অনুমোদন পেতে একটি কোম্পানির প্রসপেক্টাসে আর্থিক হিসাব অতিরঞ্জিত করে দেখানো হয় বলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে তালিকাভুক্তির সময় সব কোম্পানির ব্যবসায়িক চিত্র ভালো থাকলেও, কয়েক বছর পরে সব কোম্পানির পারফেরমেন্সে ধারাবাহিকতা থাকে না বলে দেখা যায়। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), স্টক এক্সচেঞ্জ, নিরীক্ষক, ক্রেডিট রেটিং এজেন্সি ও ইস্যু ম্যানেজার জড়িত থাকলেও কেউ দায় নিতে চায় না। কিন্তু এক্ষেত্রে দায়ভার কার?

একটি কোম্পানি ইস্যু ম্যানেজারের মাধ্যমে শেয়ারবাজারে আসে। এর আগে নিরীক্ষক ওই কোম্পানির আর্থিক হিসাবের সত্যতা যাছাই করে। এরপরে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করে এবং বিএসইসিতে মতামত দেয়। সেগুলো যাছাই-বাছাই শেষে একটি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে সময় লেগে যায় প্রায় দেড় থেকে দুই বছর। যেটা অনেক বেশি বলে মনে করেন ইস্যু ম্যানেজার ও সংশ্লিষ্ট কোম্পানি। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শেয়ারবাজারে আসার পরেও তালিকাভুক্তির পরে কিছু কোম্পানির ব্যবসায় বিচ্যুতি ঘটে।

একটি কোম্পানির প্রসপেক্টাসে ইস্যু ম্যানেজার ও অবলেখক (আন্ডাররাইটার) ডিউ ডিলিজেন্স সার্টিফিকেট দেন। এছাড়া কোম্পানির পর্ষদ পরিচালকদের দায়িত্ব ও নিরীক্ষক তার মন্তব্য তুলে ধরেন। প্রসপেক্টাসে ইস্যু ম্যানেজার সব ডকুমেন্টস দাখিল করেন বলে জানান। এছাড়া সমস্ত আইনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার নিশ্চয়তা ও সরেজমিনে কারখানা যাছাইয়ের রিপোর্ট দেন ইস্যু ম্যানেজার। আর অবলেখক প্রসপেক্টাস পরীক্ষা, কোম্পানির পরিচালক, অফিসার ও অন্যান্য এজেন্সির সঙ্গে আলোচনা এবং স্বতন্ত্রভাবে স্টেটমেন্ট যাছাই করেন বলে তথ্য সরবরাহ করেন। বিভ্রান্তিকর এমন কোন তথ্য বা প্রমাণাদি প্রসপেক্টাসে বাদ পড়েনি বলে পরিচালকদের প্রতিবেদনে জানানো হয়। এছাড়া আর্থিক প্রতিবেদন বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড ও বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ি তৈরী করা হয় বলে জানায় নিরীক্ষক। যেখানে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ রুলস, কোম্পানি আইন ও অন্যান্য প্রযোজ্য আইনকানুন পরিপালন করা হয়। আর প্রিমিয়াম নেওয়া কোম্পানির ক্ষেত্রে ক্রেডিট রেটিং এজেন্সির প্রতিবেদনও প্রসপেক্টাসে দেওয়া হয়। এসব প্রতিবেদনের পরে কমিশন ডিসক্লোজারস ভিত্তিতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ এবং পাবলিক ইস্যু রুলস অনুযায়ি আইপিও অনুমোদন দেয়।

বর্তমান কমিশনের অধীনে শেয়ারবাজারে আসার পরে বিচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে এমন কোম্পানির মধ্যে রয়েছে- এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজ, তুং হাই নিটিং, আরএন স্পিনিং, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইল, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ইত্যাদি। এরমধ্যে বেসিক ব্যাংকের ঋণ জটিলতায় উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে সম্ভাবনাময় কোম্পানি এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের। আর পারিবারিক অন্তকলহে বন্ধ হয়ে গেছে তুং হাই নিটিং ও সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলের ব্যবসায়। এছাড়া অগ্নিকাণ্ডে আরএন স্পিনিংয়ের উৎপাদন এবং পর্ষদের অন্তকলহ ও ম্যানেজম্যান্টের অদক্ষতার কারণে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বিনিয়োগকারী তথা পুরো শেয়ারবাজার।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বিভিন্ন সময় বলেছেন, কমিশন ডিসক্লোজারস বেসিস অর্থাৎ প্রসপেক্টাস দেখে আইপিও অনুমোদন দেয়। সরেজমিনে পরিদর্শন করার সুযোগ নেই। সেটা দেখার জন্য থাকে ইস্যু ম্যানেজার ও নিরীক্ষক। প্রসপেক্টাসে আইপিও’র শর্ত পরিপালন করা হয়েছে কিনা, তা যাছাই করা হয়। আর শর্ত পরিপালন না হওয়া পর্যন্ত একটি কোম্পানির আইপিও অনুমোদন দেওয়া হয় না।

শেয়ারবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, দেশের পাবলিক কোম্পানিগুলো প্রাইভেট কোম্পানির মতো চলে। যে কারনে পারিবারিক কলহ বা ১জন মারা গেলে কোম্পানি বন্ধ হয়ে যায়। বিদেশের করপোরেট গভর্ণেন্সগুলো এরকম না। যখন কোন কোম্পানি লিস্টেড হয়, তখন মালিকেরা পেছনে চলে যায়। কোম্পানি চালানোর জন্য এজেন্সী ভাড়া করা হয়। অথচ আমাদের দেশে অধিকাংশ (মেজরিটি) শেয়ার ধারন না করেও কোম্পানির চালকের আসনে থাকেন উদ্যোক্তারা। তারা কোম্পানি ভালোভাবে চালাবে এমনটি আশাও করা যায় না। এগুলো বিএসইসির দেখার বিষয়। পরিস্থিতির সঙ্গে পরিবর্তন আনতে হবে। প্রয়োজনে ওইসব কোম্পানির পরিচালকদেরকে সড়িয়ে দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, অতিরঞ্জিত মুনাফা দেখিয়ে শেয়ারবাজারে আসার জন্য নিরীক্ষক দায়ী। তারা ওই অ্যাকাউন্টসের জন্য সাক্ষর করে। কমিশন তাদেরকে কেনো নিরীক্ষকদেরকে ব্লাক লিস্টে ফেলে না। তাদেরকে কেনো দায়বদ্ধ করে না। তারপরেও বলব কমিশন কাগজপত্র ঠিকভাবে দেখে না। দেখলে ১ বছরের মধ্যে কিভাবে ঋণ খেলাপি হয়। আইপিও দেওয়ার আগে উদ্যোক্তা/পরিচালকদের অতিত ট্রেক রেকর্ড দেখতে হবে। এছাড়া এনবিআরের মাধ্যমে কর প্রদানের সত্যতা দেখতে হবে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্না ইমন এক কর্মশালায় বলেন, একটি কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসার জন্য আর্থিক হিসাব ফুঁলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখায়। ওই সময় বছরের ব্যবধানে কয়েকগুণ বিক্রয় ও মুনাফা বেড়ে যায়। যে কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির ২-৩ বছরেই লোকসানে ও ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে যায়। অথচ আইপিওতে আসার সময় যদি নিরীক্ষক সঠিকভাবে নিরীক্ষা করত, তাহলে এমনটি হওয়ার সুযোগ তৈরী হতো না।

তিনি বলেন, যেকোন কোম্পানির আর্থিক হিসাবে সমস্যার ক্ষেত্রে সবাই নিরীক্ষককে দায়ী করে। স্টক এক্সচেঞ্জ বলে আর্থিক হিসাবতো নিরীক্ষক দ্ধারা নিরীক্ষা করা হয়েছে, এখানে আমাদের কি করার আছে, ইস্যু ম্যানেজার বলে নিরীক্ষার উপর ভিত্তি করে ফাইল দাখিল করা হয় এবং বিএসইসি বলে তাদের কাছে যে কাগজপত্র দাখিল করা হয়, তার ভিত্তিতেই আইপিও দেওয়া হয়। এ থেকে বোঝা যায় একটি কোম্পানির শেয়ারবাজারে আসার সময় সবার প্রথম দায় দায়িত্ব হচ্ছে নিরীক্ষকের। তবে অন্যারা দায় এড়াতে পারে না।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) পরিচালক ও বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স এসোসিয়েশনের (বিএমবিএ) সাবেক সভাপতি ছায়েদুর রহমান বলেন, তালিকাভুক্তির পরে দূর্বল হওয়া কোম্পানির বিষয়ে সরাসরি কাউকে দোষারোপ করা কঠিন। তবে তথ্যের ভিত্তিতে দায়ীকে দোষারোপ করা যেতে পারে। মনগড়া কাউকে দোষী করা ঠিক হবে না। এছাড়া পারিবারিক কলহ, অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি কারনে একটি কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেলে কারও কিছু করার থাকে না। এমন ঘটবে তাতো কেউই আগে জানতে পারে না।

ইস্যু ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান আলফা ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের সিইও এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর আহামেদ বলেন, তালিকাভুক্তির পরে একটি কোম্পানির ব্যবসা উন্নতির দিকে থাকবে বিনিয়োগকারীদের এমন প্রত্যাশাই স্বাভাবিক। তালিকাভুক্তির পর পতন কোন বিনিয়োগকারীরই কাম্য নয়। সুনির্দিষ্ট কোন কারনে পতন হলে সেটা কারও নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নেই, যেমন বিশ্বমন্দা, প্রাকৃতিক দূর্যোগ ইত্যাদি। তবে অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে তা যাচাই বাছাই করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।


শেয়ারবার্তা / মামুন

সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে