ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০১৯, ৮ শ্রাবণ ১৪২৬

নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাম্প্রতিক উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজিবাজারে সুফল আসবে

২০১৯ মে ০১ ০৬:৫২:৪৩
নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাম্প্রতিক উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজিবাজারে সুফল আসবে

দেশের পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে স্টেকহোল্ডারদের পরামর্শে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ইতোমধ্যে অনেক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে দীর্ঘ মেয়াদে পুঁজিবাজারে সুফল আসবে।

গত সোমবার বিএসইসি’র সঙ্গে শেয়ারবাজার সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের বৈঠকে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট বন্ধ, আইপিও আইন সংস্কার, বোনাস ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

কমিশনের নতুন সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানিকে মূলধন সংগ্রহের জন্য অনুমতি নিতে হবে না। অর্থাৎ এখন থেকে যে কোনো কোম্পানি যে কোনো সংখ্যক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রাইভেট প্লেসমেন্টে শেয়ার বিক্রি করে যে কোনো অঙ্কের মূলধন সংগ্রহ করতে পারবে। কমিশন জানিয়েছে, কোনো কোম্পানি প্লেসমেন্টে যত ইচ্ছা শেয়ার বিক্রি করুক, আইপিও অনুমোদনের সময় উদ্যোক্তা-পরিচালকসহ প্রি-আইপিও সব শেয়ারে তিন বছরের লক-ইন থাকবে। লক-ইন শুরু হবে সেকেন্ডারি বাজারে লেনদেন শুরুর দিন থেকে।

বাজার সংশ্নিষ্টদের মতে, এসব সিদ্ধান্তে প্রাইভেট প্লেসমেন্টে শেয়ার বিক্রির অবৈধ বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হবে। বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ায় পারস্পরিক যোগসাজশে শেয়ারদর বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগও কমবে। একই সঙ্গে প্লেসমেন্ট বাজারে বেশি সক্রিয় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সেকেন্ডারি বাজারমুখী হবে।

এদিকে মঙ্গলবার বিএসইসি জানিয়েছে, আইপিও সংক্রান্ত যেসব সংশোধনীর নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেগুলোর জন্য সংশ্নিষ্ট আইন বা বিধি সংশোধন করা হবে। এ কারণে আইন সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো আইপিও আবেদন নেওয়া হবে না। তবে এরই মধ্যে যেসব আইপিও আবেদন জমা পড়েছে সেগুলো আগের নিয়মেই অনুমোদন পাবে।

বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, অভিহিত মূল্য ১০ টাকা দরে শেয়ার বিক্রি করতে চাইলে আইপিওতে অন্তত ৫ কোটি শেয়ার বিক্রি করতে হবে। প্রিমিয়াম চাইলে বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ার অন্তত ১০ কোটি শেয়ার বিক্রি বা ১০০ কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করতে হবে। এতে মূল বাজারে আইপিওর সংখ্যা কমে যাওয়ার শঙ্কা আছে বলে মনে করেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় অনুষদ বিভাগের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মূসা। তিনি বলেন, এর ফলে ছোট কোম্পানি এনে কারসাজির চক্র বন্ধ হবে। এতে আইপিও কমবে। 'কারসাজির বাজারের' চেয়ে কম কোম্পানি নিয়ে ভালো বাজার গড়া খারাপ উদ্যোগ নয়। তবে কোনো কোম্পানি ৫০ কোটি টাকার চেয়ে কম মূলধন সংগ্রহ করতে চাইলেও এখন বাধা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, কারণ স্বল্প মূলধনী কোম্পানিগুলোর জন্য পৃথক বাজার হচ্ছে।

বুক বিল্ডিংয়ে ডাচ্‌-অকশন মেথড প্রচলনের সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছেন বিশ্নেষকরা। আবু আহমেদ বলেন, এতদিন বুক বিল্ডিংয়ের প্রচলিত আইন ব্যবহার করেই মূল্য কারসাজি হয়েছে। এবার তা বন্ধ হতে পারে। নতুন পদ্ধতিতে যে প্রতিষ্ঠান যে দরে যত শেয়ার কিনতে চাইবে, তাকে বাধ্যতামূলকভাবে ওই দরে ওই পরিমাণ শেয়ার কিনতে হবে। এতে অস্বাভাবিক দরপ্রস্তাব কমবে। লভ্যাংশ আকারে বোনাস শেয়ার ঘোষণার ক্ষেত্রে বাড়তি মূলধন নিয়ে কোম্পানির পরিকল্পনা ঘোষণার সিদ্ধান্ত বিষয়ে তিনি বলেন, অযথা বোনাস ঘোষণা বন্ধ হবে, যা কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি মজবুত করবে।

বুক বিল্ডিংয়ে ডাচ্‌-অকশন পদ্ধতি প্রচলন এবং বোনাস শেয়ার ইস্যুতে মূলধন ব্যবহারের পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করার বিষয় এক বছর আগে বিএসইসিতে আলোচনায় উঠেছিল। এক বছরের ব্যবধানে এ বিষয়ে আইন করার কারণ জানতে চাইলে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান বলেন, পরিস্থিতির কারণে কমিশনকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। আইপিও ও প্লেসমেন্ট নিয়ে অন্য অনেকের দায় থাকলেও সবাই এখন শুধু কমিশনকে দায়ী করছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, কেউ নিজেদের দায়-দায়িত্বের কথা বলছেন না, এটা ঠিক নয়।

কমিশনের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো ভালো বলে উল্লেখ করে শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ বলেন, প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে আইপিও শেয়ারের দর বাড়ানোর যে প্রতিযোগিতা ছিল, তা বন্ধ হবে। যদিও এরই মধ্যে যেসব কোম্পানি বিপুল প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রি করে তালিকাভুক্ত হয়েছে বা হওয়ার অপেক্ষায় আছে, সেগুলোর কারণে বাজার আরও কয়েক বছর দুর্ভোগ পোহাবে। এ দুর্ভোগ কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে সংশ্নিষ্টদের এখন থেকে ভাবতে হবে।

ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, এ সিদ্ধান্তে প্লেসমেন্ট বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হবে। মনে হতে পারে, এর ফলে বিএসইসি হয়তো আইপিওতে আসতে আগ্রহী কোম্পানিগুলোকে যথেচ্ছ প্লেসমেন্ট শেয়ার বিক্রির সুযোগ করে দিয়েছে। বাস্তবতা হলো, এ সিদ্ধান্তে কোনো কোম্পানি চাইলেও ক্রেতা পাবে না। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, লক-ইনসহ প্লেসমেন্ট শেয়ার অন্তত চার বছর ধরে রাখতে হবে। যারা প্রকৃত বিনিয়োগকারী, তারা ছাড়া কোনো শেয়ার ব্যবসায়ী প্লেসমেন্ট শেয়ার কিনবে না।

শেয়ারবার্তা / শহিদুল ইসলাম

সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে