ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬

যে কারণে ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ

২০১৯ এপ্রিল ১২ ১০:২৯:০৬
যে কারণে ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ

শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে না--এমন নন-পারফর্মিং কোম্পানির কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠনের বিষয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আবারও নড়েচড়ে বসেছে। এক বছরের বেশি সময় ধরে স্টক এক্সচেঞ্জে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে পড়ে থাকা কোম্পানিগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠনসংক্রান্ত পুরনো নোটিফিকেশনটি আবারো কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। নোটিফিকেশনটি পর্যালোচনা করে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দাখিলের জন্য ইতোমধ্যে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, ব্যবহারিক সব দিক পর্যালোচনা করে নন-পারফর্মিং কোম্পানিগুলোর বিষয়ে কী করা সবচেয়ে ভালো হবে, কমিটি সেটিই বিবেচনা করবে। পুরনো নোটিফিকেশনটি বলবৎ করা, প্রয়োজনে সেখানে সংশোধন আনার চেষ্টা থাকবে কমিটির।

উল্লেখ্য, শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ পর্ষদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ২০০২ সালের ১ আগস্ট ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠনসংক্রান্ত নোটিফিকেশনটি জারি করে তৎকালীন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)।

সেখানে বলা হয়েছিল, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি স্টক এক্সচেঞ্জে এক বছরের বেশি সময় ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে থাকলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষকে এর পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য নোটিফিকেশনের বিষয়বস্তু হওয়ার ছয় মাসের মধ্যে শেয়ারহোল্ডারদের বিশেষ সাধারণ সভা (ইজিএম) করে সেখানে উদ্যোক্তাপক্ষ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সমন্বয়ে নতুন করে পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়ায় যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া নিছক ব্যক্তি বদল করে পুনর্গঠিত পর্ষদের নিয়ন্ত্রণ ব্যর্থ উদ্যোক্তাদের হাতেই ন্যস্ত রাখার পথ রুদ্ধ করতেও সেখানে বেশকিছু বিধিনিষেধ দেয়া হয়েছিল। উদ্যোক্তাদের নিকটজন, কোম্পানির নিরীক্ষক বা পরামর্শক, বড় গ্রাহক কিংবা সরবরাহকারী প্রাতিষ্ঠানিক অথবা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রতিনিধি হিসেবে পর্ষদে আসতে পারবেন না। সেখানে আরো বলা হয়েছিল, উদ্যোক্তারা কোম্পানির অন্তত ৫০ শতাংশ শেয়ারের মালিক না হলে পুনর্গঠিত পর্ষদের চেয়ারম্যান পদে তাদের কাউকে রাখা যাবে না।

নোটিফিকেশনে আরো বলা হয়, সব পক্ষের সমন্বয়ে নতুন পর্ষদ গঠনের ছয় মাসের মধ্যে কোম্পানির পরিচালন ও আর্থিক ব্যর্থতার কারণগুলো শনাক্ত করতে হবে পর্ষদকে। ব্যর্থতার জন্য কোম্পানির কোনো কর্মকর্তা, পরিচালক বা নিরীক্ষক দায়ী হলে তাদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপও নিতে হবে। এরপর কোম্পানিকে লাভজনকভাবে চালানোর একটি বিশদ কর্মপরিকল্পনাসংবলিত পরিচালকমণ্ডলীর প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। পর্ষদ পুনর্গঠনের সাত মাসের মধ্যে শেয়ারহোল্ডারদের সাধারণ সভা করে এ পরিকল্পনায় অনুমোদন নিতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও এক্সচেঞ্জকে এসব বিষয়ে যথাযথভাবে অবহিত করতে হবে।

পর্ষদ পুনর্গঠনের ২৪ মাসের মধ্যে কোম্পানির পরিচালন ও আর্থিক অবস্থার উন্নতি দেখাতে না পারলে কর্তৃপক্ষ কোম্পানির অবসায়ন বা অন্য কোনো কোম্পানির সঙ্গে একীভূতকরণের আইনসম্মত উদ্যোগ নেবে। দুই বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর তিন মাসের মধ্যে ইজিএম করে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন চাইতে হবে। সবকিছু বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে পর্ষদের ওপর।

প্রসঙ্গত, ২০০২ সালের নোটিফিকেশনটি জারির পর মোনা ফুড ইন্ডাস্ট্রি নামের একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পর্ষদ ভেঙে তা কার্যকর করা হয়েছিল। ব্যর্থ উদ্যোক্তাদের সরিয়ে আলী জামান নামের একজন বিনিয়োগকারীকে কোম্পানির পর্ষদের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। তবে সে কোম্পানিটি বর্তমানে স্টক এক্সচেঞ্জের ওভার দ্য কাউন্টার মার্কেটে রয়েছে। এরপর নিলয় সিমেন্ট নামের একটি কোম্পানিতেও একই চেষ্টা হয়। শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তারা কোম্পানিটিকে তালিকাচ্যুত করে নেন।

সে সময় বেশ কয়েকটি ব্যর্থ কোম্পানির উদ্যোক্তারা কমিশনের নোটিফিকেশনকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট করেছিলেন, কয়েক বছর পর যেটি খারিজ হয়ে যায়। তবে সিকিউরিটিজ নিয়ন্ত্রকদের মধ্যে আর নোটিফিকেশনটি বলবৎ করার কোনোো চেষ্টা দেখা যায়নি।

সাম্প্রতিক সময়ে স্টক এক্সচেঞ্জে বেশ কয়েকটি নন-পারফর্মিং কোম্পানির চরম দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি পুঁজিবাজারের পরিবেশ নষ্ট করতে থাকলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ তাদের ক্ষমতাবলে কয়েকটি কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিছু কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করার বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতামত চায় তারা। এদিকে অকস্মাৎ তালিকাচ্যুতি বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ উদ্যোক্তাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয় আর সাধারণ বিনিয়োগকারীকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বলেও মত উঠে আসতে থাকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন কোম্পানির পর্ষদ পুনর্গঠন সম্পর্কিত পুরনো নোটিফিকেশনটি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়।

তালিকাভুক্ত কোনোো কোম্পানি নগদ কিংবা স্টক কোনো প্রকারের লভ্যাংশ না দেয়া, সময়মতো বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) না করা কিংবা ছয় মাসের বেশি পরিচালন কার্যক্রমে না থাকার মতো কারণ ঘটলে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুযায়ী কোম্পানিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেয়। তখন কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন নিষ্পত্তির চক্রটি দীর্ঘ হয়ে যায়। অন্য সব শেয়ার কেনার দুই কার্যদিবসের মধ্যে বিক্রয় উপাযোগী হলেও ‘জেড’ ক্যাটাগরির ক্ষেত্রে এজন্য ১০ কার্যদিবস অপেক্ষা করতে হয় এবং ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ার কেনাবেচায় কোনো মার্জিন ঋণ নিতে পারেন না বিনিয়োগকারী।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণ না করলেও কোম্পানিগুলোর পরিচালকরা যথারীতি পুঁজিবাজার থেকে অর্থ লুটে নিচ্ছেন। তালিকাভুক্ত সিংহভাগ কোম্পানির পরিচালকরা নিজেরা সরাসরি তাদের কোম্পানির শেয়ার নিয়ে সারাবছর কারসাজিতে যুক্ত থাকেন। যে কারণে কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরে বছরজুড়ে বড় লম্পঝম্প দেখা যায়। ‘জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলো বাজারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পথে প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করে বলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা মনে করে। সেজন্য শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সংরক্ষণে জেড’ ক্যাটাগরির কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সংস্থাটি।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার বিএসইসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম খায়রুল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ৬৮২তম কমিশন সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। সভা শেষে নির্বাহী পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিএসইসি জানায়, কমিশনের পরিচালক মো. মনসুর রহমান হবেন কমিটির আহ্বায়ক, উপপরিচালক শেখ মো. লুত্ফুল কবির সদস্য ও উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম সদস্য সচিব। তারা ২০০২ সালের নোটিফিকেশনটি পর্যালোচনা করে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে কমিশনকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ দেবেন।

শেয়ারবার্তা / শহিদুল ইসলাম

সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে