ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬

মুদ্রা বাজারে আন্তঃব্যাংক সুদহার পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ

২০১৯ এপ্রিল ০৭ ০৭:০০:২০
মুদ্রা বাজারে আন্তঃব্যাংক সুদহার পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ

বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণ তুলনামূলক কমলেও চাহিদার বিপরীতে প্রয়োজনীয় আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না অনেক ব্যাংক। অন্যদিকে রমজান উপলক্ষে পণ্য আমদানিতে নিয়মিত ডলার কিনছে ব্যাংকগুলো। এসব কারণে এক মাসের ব্যবধানেই ব্যাংক খাতের অতিরিক্ত তারল্য কমেছে ছয় হাজার কোটি টাকার ওপরে। ফলে নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে মুদ্রা বাজার থেকে ধার বাড়ছে ব্যাংকগুলোর। এতে বাড়ছে আন্তঃব্যাংক মুদ্রা বাজারে সুদের হার; যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ হারে পৌঁছেছে।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে বিভিন্ন সিকিউরিটিজের বিপরীতে ধার নিতে পারে। এ পদ্ধতি রোপো নামে পরিচিত। এক্ষেত্রে ছয় শতাংশ সুদ দিতে হয়। কোনো কারণে রেপোর মাধ্যমে অর্থ না পাওয়া গেলে বিশেষ রেপোতে উচ্চ সুদ অর্থাৎ ৯ শতাংশে নিতে হয় ব্যাংকগুলোকে। এর পাশাপাশি অন্য বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকেও স্বল্প মেয়াদে ধার করে প্রয়োজন মেটায় ব্যাংকগুলো। এটি আন্তঃব্যাংক মুদ্রা বাজার নামে পরিচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ৩ এপ্রিলে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে সুদহার সর্বোচ্চ উঠেছে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ ও গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক ৩২ শতাংশে। গত ডিসেম্বরে এ বাজারে সুদের হার সর্বোচ্চ ছয় শতাংশ থাকলেও মার্চ শেষে হয়েছে ১০ দশমিক ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর আগে সর্বশেষ ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সর্বোচ্চ সুদহার উঠেছিল ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ। বছরটিতে জানুয়ারি মাসে এ হার ছিল ছয় দশমিক ২৫ থেকে ছয় দশমিক ৭৫ শতাংশে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, পবিত্র রমজান উপলক্ষে পণ্য আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে ডলার সহজলভ্য করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পণ্য আমদানি ব্যয় মেটাতে ব্যাংকগুলো চাহিদা অনুযায়ী ডলার কিনতে পারবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে। ব্যাংকগুলো অন্য ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার না পেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে নিতে পারবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ বিষয়ে জানিয়েছেন, রমজানকে সামনে রেখে পণ্য আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকগুলোর টাকার চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে সংকটে ভুগতে থাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে অনেক ব্যাংকই ডলার কিনেছে। এতেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে টাকা জমা পড়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর কাছে নগদ টাকার প্রবাহ কিছুটা হলেও আগের চেয়ে কমেছে। অন্যদিকে আমানতের প্রবৃদ্ধি ঋণের চেয়ে কম হওয়ায় নগদ অর্থের চাহিদা বাড়ছে ব্যাংকের। ফলে ডলার কেনা ও নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে আন্তঃব্যাংক মুদ্রা বাজারে সুদহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাসের ব্যবধানে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে গড় সুদহার আড়াই শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে সাড়ে ছয় শতাংশ। ডিসেম্বরে ব্যাংকগুলো আমানতের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে রেপো ও বিশেষ রেপোর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের অর্থ নিয়েছিল। একই সঙ্গে নিয়েছিল অন্য ব্যাংকের কাছ থেকেও।

কিন্তু জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে রেপো ও বিশেষ রেপোর মাধ্যমে মাত্র ২৯৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ধার নিয়েছিল ব্যাংকগুলো। এ সময় অর্থের তেমন চাহিদা না থাকায় আন্তঃব্যাংক মুদ্রা বাজারে সুদের হার তেমন বৃদ্ধি পায়নি।

কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাসে রেপো ও বিশেষ রেপোর মাধ্যমে অর্থ নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পায় ব্যাংকগুলোর। মাসটিতে উচ্চ সুদের বিশেষ রেপোতে পাঁচ হাজার ৪৬০ কোটি টাকা নেয় ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে এ সময়ে রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো ধার নেয় সাত হাজার ৩৬৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা।

আন্তঃব্যাংক মুদ্রা বাজার থেকে ফেব্রুয়ারি মাসেও দৈনিক গড়ে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো ধার নিয়েছে ব্যাংকগুলো। এ মাসের শুরুতে সুদের হার সাড়ে তিন থেকে ছয় শতাংশের মধ্যে ছিল; যা মাস শেষে সর্বনিম্ন চার থেকে সর্বোচ্চ ৯ টাকা ২৫ পয়সায় দাঁড়ায়। গড় সুদহার দাঁড়ায় পাঁচ টাকা ৫১ পয়সায়।

গত মার্চ মাসের শুরুতে এ বাজারে সুদের হার সর্বনিম্ন উঠে পাঁচ দশমিক ৭৫ শতাংশে। এ সময়ে সর্বোচ্চ সুদহার দাঁড়ায় আট দশমিক ৭৫ শতাংশে। মাসটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে রেপোর মাধ্যমে ১৫ হাজার ৯৭৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ধার করে ব্যাংকগুলো। এ সময়ে বিশেষ রেপোতে উচ্চ সুদে ধার করে মাত্র ১৬০ কোটি টাকা। মাসের শেষে তা বৃদ্ধি পেয়ে সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ২৫ শতাংশে ওঠে। এ সময়ে গড় সুদহার পাঁচ দশমিক ৯৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ছয় দশমিক ২৭ শতাংশে উন্নীত হয়।

সর্বশেষ ৩ এপ্রিলে এ বাজারে সুদহার সর্বোচ্চ উঠেছে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ ও গড় সুদহার দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক ৩২ শতাংশে। অর্থাৎ ১০০ টাকার বিপরীতে এক ব্যাংক অন্য ব্যাংকের কাছ থেকে স্বল্প মেয়াদের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে সুদে টাকা ধার নিয়েছে। অন্যদিকে চলতি মাসের শুরু থেকেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে বিশেষ রেপোর মাধ্যমে ৬২০ কোটি টাকা ধার নিয়েছে ব্যাংকগুলো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেক প্রতিবেদন বলছে, গত জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মোট তরল সম্পদের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৬৪ হাজার ২৬৭ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ছয় মাস পর গত ডিসেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় দুই লাখ ৫৫ হাজার ১৬৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এ সময়ে ব্যাংকগুলোর কাছে বিনিয়োগযোগ্য অতিরিক্ত নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ২২৭ কোটি টাকা।

গত জানুয়ারি মাসে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৪৮ হাজার ৪১৯ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। এই সময়ে ব্যাংকগুলোর কাছে বিনিয়োগযোগ্য অতিরিক্ত নগদ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এক মাসেই ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত বিনিয়োগযোগ্য নগদ অর্থ কমেছে ছয় হাজার ১৬৫ কোটি ১৬ লাখ টাকা। অন্যদিকে সাত মাসের (জুন-জানুয়ারি) ব্যবধানে ব্যাংক খাতে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ কমেছে ১৫ হাজার ৮৪৭ কোটি ৫০ লাখ টাকার।

শেয়ারবার্তা / মামুন

অনুসন্ধানী রিপোর্ট এর সর্বশেষ খবর

উপরে