ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০১৯, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া খেলাপি ঋণ কমবে না

২০১৯ ফেব্রুয়ারি ২৭ ০৭:৪০:২০
সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া খেলাপি ঋণ কমবে না

খেলাপি ঋণের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত হুমকির মুখে পড়েছে। ব্যাংক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঋণ কেলেঙ্কারি অর্থনীতিতে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছেই জিম্মি হয়ে পড়েছে ব্যাংকিং ব্যবস্থা। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর প্রভাব বিস্তার করে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন ব্যাংক উদ্যোক্তারা। এতে বাড়ছে ঋণ কেলেঙ্কারি। ঋণ নিয়ে ফেরত না দেওয়ায় খেলাপির পরিমাণ লাখো কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অনাদায়ী এসব ঋণের কারণে ব্যাংকে তারল্য সংকট তৈরি হচ্ছে।

আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া খেলাপি ঋণ আদায় ও নতুন খেলাপি কমানো সম্ভব নয়। এছাড়া আর্থিক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ৪৮ হাজার ৮০ কোটি টাকা, বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের পাঁচ হাজার ২৪১ কোটি টাকা, বেসরকারি খাতের ব্যাংকের ৪৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা ও বিদেশি ব্যাংকের দুই হাজার ৩৮২ কোটি টাকা।

ব্যাংক খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণেই এসব ঋণ দেওয়া হয়েছে বেশি। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থগ্রহীতারা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। অনেকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি। তাই খেলাপি হওয়া ঋণ উদ্ধারে সরকারের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। এর সঙ্গে প্রয়োজন আইনি সংস্কার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী খেলাপি ঋণ তিনবারের বেশি পুনঃতফসিল করা যাবে না। কিন্তু এমনও ঘটনার নজির আছে, ১৫ বার পর্যন্ত ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের এ উচ্চহার ব্যাংক খাতে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকটও প্রবল হচ্ছে। সিপিডির গবেষণায় উঠে এসেছে, গত ১০ বছরে ব্যাংক খাত থেকে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে ঋণের নামে। এসবের মধ্যে হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, অ্যানন টেক্স, ক্রিসেন্ট উল্লেখযোগ্য। বেসিক ও ফারমার্স ব্যাংকও এখন লোকসানে রয়েছে এসব ঘটনায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, সরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকের বেলায় সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বেসরকারি খাতের ব্যাংকের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকই যথেষ্ট।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে। সরকারকেই নেতৃত্বের আসনে বসতে হবে। ঋণখেলাপিদের বিষয়ে দুদকও খোঁজ নিতে পারে। নতুন করে খেলাপি কমাতে জিরো টলারেন্স দিতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন খেলাপি ঋণ আদায়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পদক্ষেপের বিষয়ে বলেন, সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জড়ালে তার প্রতি সুবিচার করা হবে না। এতে সমাধান দীর্ঘায়িত হবে। প্রতিটি বিষয় দেখভালের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, এটি তাদেরই কাজ। প্রভাবশালীদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবন্ধকতা এলে সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চাওয়া যেতে পারে। এটি আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিকভাবেই নেওয়া যেতে পারে। খেলাপি ঋণ আদায়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে, সবাইকে ঝুঁকি নিতে হবে এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে।

পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়, আদালত ও সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এজন্য সিদ্ধান্ত আসতে হবে। নইলে দ্রুত সমাধান হবে না। আইন সংশোধন তো সরকারকেই করতে হবে।

ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম আইন সংশোধন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়ে অবশ্য সবাই একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ কমাতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক সমর্থন প্রয়োজন। সরকারকে দেখতে হবে, ঋণ প্রস্তাব ও অনুমোদনে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হচ্ছে কি না। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আছেন, সরকারকে ভুল বুঝিয়ে থাকেন। ঋণ ফেরত দিলে কারখানা চলবে না, কর্মচারী বেকার হবে এসব কথা অনেক শোনা হয়েছে, এখন অর্থ আদায় করা দরকার। এতে তাদের কারখানা বন্ধ হলে হোক।

মির্জ্জা আজিজ আরও বলেন, এসব অর্থ নতুন উদ্যোক্তাদের দিলে বিনিয়োগ বাড়বে। তাতেও কর্মসংস্থান তৈরি হবে। ব্যাংকের ঋণ প্রদান সক্ষমতা বাড়বে এবং আর্থিক খাতের উন্নয়ন হবে। এছাড়া সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ঘোষণা দেওয়া প্রয়োজন, ঋণ প্রস্তাবে কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করা হবে না।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংককেও এগিয়ে আসতে হবে। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অর্থ আটকে থাকায় নতুন বিনিয়োগ করা যাচ্ছে না, অর্থ উদ্ধার করে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, যা প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হতো। জনগণ এই অর্থের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

খেলাপি কমিয়ে আনার বিষয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারকে দেখতে হবে নিয়ম মেনে ঋণ দেওয়া হচ্ছে কি না, ঋণ প্রদানে কোনো অনিয়ম হচ্ছে হচ্ছে কি না, সঠিক জায়গায় ঋণের অর্থ যাচ্ছে কি না, তাও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকগুলোর ওপর নিয়মিত নজরদারি রাখতে হবে। বিশেষ করে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে হচ্ছে কি না। এসব বিষয়ে সরকার রাজনৈতিকভাবে বলতে পারে। তিনি আরও বলেন, আইনি জটিলতায় আটকে থাকা অর্থ দ্রুত সমাধানে সরকার বিশেষ আদালত গঠন করতে পারে। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণ ফেরত দিচ্ছে না, তাদের ব্যাপারে কঠোর হতে হবে।

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, খেলাপিদের কাছ থেকে অর্থ আদায় সম্ভব না হলে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে। এছাড়া প্রশাসনিক উদ্যোগ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিতে হবে। ঋণখেলাপিদের সামাজিক কিছু সুবিধার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতে হবে। ভারতে ঋণখেলাপিরা বিমানের টিকিট কিনতে পারেন না। বাংলাদেশেও এরকম কিছু উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

খেলাপি ঋণ আদায় ও নতুন খেলাপি কমিয়ে আনার বিষয়ে জাহিদ হোসেন মনে করেন, প্রথমেই প্রয়োজন আইনি সংস্কার; এটি সরকারকেই করতে হবে। গ্রহণযোগ্য আইনি সংশোধনী করতে সংশ্লিষ্ট সব খাতের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলতে হবে। আইন সংস্কারের সঙ্গে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), অর্থ মন্ত্রণালয়, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট সব নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকায়। এর মধ্যে শিল্প খাতের ঋণই হচ্ছে চার লাখ ৪৮ হাজার ১৮২ কোটি টাকার ওপরে। ডিসেম্বরের শেষের তথ্য যোগ করলে পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে।

এছাড়া এ পর্যন্ত অবলোপন (রাইট অফ) করা হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে খেলাপি হওয়া ঋণের ৭০ হাজার কোটি টাকা পুনঃতফসিল ও পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে সরকারি উচ্চপর্যায়ের চাপে। এসব তথ্য যোগ করলে প্রকৃত খেলাপির পরিমাণ দুই লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

শেয়ারবার্তা / শহিদুল ইসলাম

সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে