ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০১৯, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা

২০১৯ ফেব্রুয়ারি ২৭ ০৭:৩০:৩২
এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা

খেলাপি ঋণ ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে গোটা আর্থিক খাত হুমকির সম্মুখীন। খেলাপি ঋণের লাগাম টানতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রতি কঠোর বার্তা ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। বড় গ্রাহকদের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলে বিশেষ সুযোগও দেয়া হয়েছিল। তার পরও শুধু বিদায়ী বছরেই ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে সাড়ে ১৯ হাজার কোটি টাকা বা ২৬ শতাংশের বেশি। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির হার ও পরিমাণ—দুই বিবেচনায়ই গত পাঁচ বছরের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ।

দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ও খেলাপি ঋণের প্রতিবেদন প্রতি তিন মাস অন্তর তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও বিদেশী খাতের ব্যাংকগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। বিদায়ী বছরের ডিসেম্বর শেষের খেলাপি ঋণের প্রতিবেদন গতকাল চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩১ ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। ২০১৭ সাল শেষে যেখানে ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ ছিল ব্যাংকিং খাতে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৮ সাল শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৩০ শতাংশে। তবে ২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের তুলনায় ৩১ ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ৫ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা কমেছে। কিছু ব্যাংকের আদায় বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও ঋণ অবলোপনের কারণে এ পরিমাণ খেলাপি ঋণ কমেছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বছরের শুরু থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাধারণত খেলাপি ঋণ ঊর্ধ্বমুখী ছিল। কিন্তু ডিসেম্বরে আর্থিক প্রতিবেদন ভালো দেখাতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে ব্যাংকগুলো। স্বাভাবিক পন্থায় আদায় অযোগ্য খেলাপি ঋণ অবলোপন করা হয়। এ কারণে ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ অনেকটা কমে আসে। ২০১৮ সালে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেও খেলাপি ঋণের হার ও পরিমাণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নামেনি।

তবে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমিয়ে আনতে পারাকে সফলতা হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিদায়ী বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ডিসেম্বর প্রান্তিকে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নির্দেশ ও ব্যাংকগুলোর প্রচেষ্টায় এটি সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, তফসিলি ব্যাংকগুলো নিজেদের স্বার্থেই খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের মধ্যে থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তা ৩০ শতাংশ। এর প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপরই পড়ে। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে রাষ্ট্রের অনেক সামাজিক কাজও করতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির খাতায় ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকার ঋণ, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ১০ দশমিক ৩০ শতাংশ। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা, যা ছিল ওই সময় পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণের ৯ দশমিক ৩১ শতাংশ। ওই সময় ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ ছিল ৭ লাখ ৯৮ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এ হিসাবে এক বছরে ব্যাংকিং খাতে ১ লাখ ১৩ হাজার ২০৮ কোটি টাকার ঋণ বেড়েছে। অর্থাৎ ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা বা ২৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এ হিসাবে বিদায়ী বছরে ব্যাংকিং খাতে ঋণের চেয়ে অনেক বেশি হারে বেড়েছে খেলাপি ঋণ।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোর ব্যালান্স শিট বড় হচ্ছে। এতে ব্যাংকিং খাতে ঋণের পরিমাণও বাড়ছে। ঋণ বাড়লে খেলাপি ঋণের পরিমাণও বাড়ে। তবে দেখতে হবে খেলাপি ঋণের হার বাড়ছে কিনা? পরিমাণের পাশাপাশি যদি হারও বাড়ে, সেটিই উদ্বেগের।

খেলাপি ঋণকে দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যা উল্লেখ করে এ ব্যাংকার বলেন, আর্থিক খাতে এটি ক্যান্সার হিসেবে দেখা দিয়েছে। এ রোগ সারাতে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। যেসব খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠন করা হয়েছিল, সেগুলোর অনেক ঋণ আবার খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১২ সালে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। দেশের ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ বেড়েছিল ওই বছর। মূলত বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ও সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির মতো বৃহৎ ব্যাংক জালিয়াতির ঘটনা ওই বছর থেকে আলোচনায় আসে। এতেই ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। তবে ২০১৩ সালে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ২ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা কমে আসে। কিন্তু ২০১৪ সালে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ৯ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকা বেড়ে ৫০ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এর পর থেকেই বাড়ছে এটি। ২০১৫ সালে ১ হাজার ২১৬ কোটি, ২০১৬ সালে ১০ হাজার ৮০১ কোটি এবং ২০১৭ সালে ১২ হাজার ১৩১ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ বেড়েছে।

২০১৮ সাল শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণ ছিল ১ লাখ ৬২ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপির খাতায় উঠেছে ৪৮ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকার ঋণ, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ২৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। একই সময়ে বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঋণ ছিল ২৪ হাজার ৬০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ছিল ৪ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকার ঋণ, যা ব্যাংক দুটির বিতরণকৃত ঋণের ১৯ দশমিক ৪৬ শতাংশ।

৩১ ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ ছিল ৬ লাখ ৮৮ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ছিল ৩৮ হাজার ১৩৯ কোটি টাকার ঋণ, যা বেসরকারি ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আর বিদেশী খাতের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ৩৫ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ছিল ২ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। এ ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ খেলাপি।

শেয়ারবার্তা / শহিদুল ইসলাম

সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে