ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০১৯, ৫ বৈশাখ ১৪২৬

পুঁজিবাজারে প্লেসমেন্টের নামে অবৈধ শেয়ার লেনদেন হয়

২০১৯ ফেব্রুয়ারি ০৫ ০৬:৩৯:০৮
পুঁজিবাজারে প্লেসমেন্টের নামে অবৈধ শেয়ার লেনদেন হয়

যখন কোনো কোম্পানি আইপিও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসে তখন ওই কোম্পানির শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ করার সময় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা করা হয়। শেয়ারের মূল্য নির্ধারণে প্রায় সময় অস্বচ্ছতা থাকে। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নজর দিতে হবে। খুজিস্তা নূর-ই নাহারীনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এনবিইআরের চেয়ারম্যান ড. আহসানুল আলম পারভেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান।

আহসানুল আলম পারভেজ বলেন, ২০১৮ সালে পুঁজিবাজার ভালো অবস্থানে ছিল না এবং শেষের দিকে টার্নওভার ৩০০ কোটি টাকার মধ্যে ছিল। নির্বাচনের পর টার্নওভার ৩০০ কোটি টাকা থেকে ১০০০ ও ১১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত হয়েছে এবং এর সঙ্গে সূচক শেয়ারের দামও বেড়েছে। কিন্তু ঘুরে ফিরে আবার একই অবস্থানে ফিরে আসছে বাজার।

তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জায়গা, এটা ডে ট্রেডিং করার জায়গা নয়। আসলে ডে ট্রেডিং করার বিশেষ কারণ রয়েছে কারণ এখানে ক্যাপিটাল গেইন ছাড়া আর কোনো গেইন নেই। যেসব কোম্পানি ভালো প্রফিট করে তারা সে অনুপাতে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দেয় না। ফলে ডে ট্রেডিংয়ের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক বেশি। এ বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিতে হবে।

মিজানুর রহমান বলেন, বাজার মূলধন চার লাখ কোটি টাকার উপরে। সেখানে দৈনিক টার্নওভার এক শতাংশেরও কম। আবার পুঁজিবাজারের বার্ষিক টার্নওভার জিডিপির ১২ শতাংশ। এটা আসলে পুঁজিবাজারের উন্নয়নের কোনো নির্দেশক নয়। এতে বোঝা যায় দেশের পুঁজিবাজার অর্থনীতির মূলধারা থেকে বিছিন্ন এবং কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে না। আবার দেশের বেসরকারি ও সরকারি খাতের বিনিয়োগ ব্যাংক নির্ভর। এখান থেকে অতি শিগগিরই বের হয়ে আসতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পুঁজিবাজারের টার্নওভার তাদের জিডিপির ১০০ শতাংশ, পাকিস্তানে জিডিপির ৭০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কা ৯০ শতাংশ, ভিয়েতনামে ১০২ শতাংশ বার্ষিক টার্নওভার। দেশের প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার বলেছেন, দেশে বিনিয়োগ চাহিদা ব্যাপক এবং তা পূরণ করতে হবে পুঁজিবাজারে কোম্পানিগুলোকে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে। কিন্ত সেই জায়গায় কেন সফল হচ্ছে না।

নির্বাচনের পর টার্নওভার ৩০০ কোটি টাকা থেকে হাজার কোটি টাকা হয়েছে। সেটা প্রত্যাশিত ছিল। বিনিয়োগকারীদের বাজারের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে হলে তাদের বিনিয়োগের সুরক্ষা দিতে হবে। এ জন্য ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শাসনব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে হবে। বিদ্যামান নিয়মনীতি পরিবর্তন ও বাজারকে আরও সম্প্রসারিত করতে হবে। এ জন্য ভালো মানের কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং নতুন শাসন কাঠামো নিয়ে আসতে হবে। যাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরি হতে পারে। যখন কোনো কোম্পানি আইপিও’র মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আসে তখন ওই কোম্পানির শেয়ারের যে মূল্য নির্ধারণ করা হয় তা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা। মূল্য নির্ধারণে প্রায় সময় অস্বচ্ছতা থাকে। এ বিষয়ে নজর দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বুকবিল্ডিং বলেন আর ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতি যাই হোক না কেন সব ক্ষেত্রেই প্রিমেটিক পদ্ধতিতে আইপিও’র মূল্য নির্ধারণ করা হয়। প্লেসমেন্টের নামে অবৈধ ও বেআইনিভাবে শেয়ার লেনদেন করা হয়। ব্রোকারেজ হাউজ ও সংশ্লিষ্ট মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো প্লেসমেন্ট লেনদেনের নামে প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ স্থরে বেআইনিভাবে লেনদেন করে। এতে করে বিনিয়োগকারীরা অনেকে মূলধন হারাচ্ছে। আমি জানি, অনেক কোম্পানির আইপিও পদ্ধতিতে অসংখ্য বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে পুঁজিবাজারে আসা নতুন বিনিয়োগকারীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

আইপিওতে বিনিয়োগ করে অসংখ্য বিনিয়োগকারী লোকসান করেছে। আইপিও মাধ্যমে যখন কোম্পানিগুলো অন্তর্ভুক্ত হয় তখন তাদের স্থাবর-অস্থাবর সব ধরনের সম্পদের ভিত্তিতে শেয়ারপ্রতি আয় দেখায়। যে প্রক্রিয়াটি অস্বচ্ছ। কোম্পানির বিভিন্ন ধরনের যেসব আয় দেখায় সেগুলো তার মূল আয় নয়। এ কারণে এ ধরনের আয়ের উৎসগুলোকে পৃথক করে দেখাতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার যারা নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তির অনুমোদন দেবেন তাদের দেখতে হবে, কোম্পানির ভবিষ্যৎ আয়ের উৎস কি কি আছে? কারণ ২০১০ সালের পর পুঁজিবাজারে প্রায় ১০০টি কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ওই সব কোম্পানির শেয়ারের দাম অফার প্রাইজের নিচে কেনাবেচা হচ্ছে। ফলে বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদি ভালো মানের শেয়ার, বন্ড প্রভৃতি আনা যায় সেক্ষেত্রে পুঁজিবাজারে তারল্য বৃদ্ধি পাবে।

পুঁজিবাজারের অন্তর্ভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ড খাতটি ধংস করা হচ্ছে। মিউচুয়াল ফান্ডের ম্যানেজাররা মিউচুয়াল ফান্ড ইস্যু করে টাকা উত্তোলন করে জেড ক্যাটেগরির শেয়ারে বিনিয়োগ করে। তারা ওই টাকা অপব্যবহার করেছে। আসলে ওখানে কোনো স্বচ্ছতা নেই। এনইভি অনুযায়ী মিউচুয়াল ফান্ডের মূল্য ২০ টাকা হওয়া উচিত অথচ মার্কেটে কেনাবেচা হয় আট টাকায়। নিশ্চয়ই এটি দেখার দায়িত্ব বিএসইসির। আমরা জানি মিউচুয়াল ফান্ড হচ্ছে ঝুঁকিমুক্ত অথচ বাস্তবে এর বিপরীত চিত্র দেখা যায়।

তিনি আরও বলেন পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে স্বাধীন হতে হবে। যারা বিনিয়োগকারীর স্বার্থে কাজ করবে, সরকারের স্বার্থে কাজ করবে এবং একটি আধুনিক স্টক এক্সচেঞ্জের উন্নয়নের জন্য কাজ করাই তাদের লক্ষ্য হবে। এখানে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। যদি পুঁজিবাজারের উন্নয়ন করতে চাইলে এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে হলে বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার যে বেহাল অবস্থা তার তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন অতি জরুরি। বর্তমান সরকার চতুর্থ মেয়াদে সরকার গঠন করছে এবং কিছু পরিবর্তন দেখা গেছে।

শেয়ারবার্তা / জুয়েল

বাজার বিশ্লেষণ এর সর্বশেষ খবর

উপরে