ঢাকা, বুধবার, ২০ মার্চ ২০১৯, ৬ চৈত্র ১৪২৫

পাওয়ার গ্রিডের সম্পদ কাগজে আছে, গোয়ালে নেই

২০১৮ ডিসেম্বর ২৫ ১০:৫৪:০৪
পাওয়ার গ্রিডের সম্পদ কাগজে আছে, গোয়ালে নেই


পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রায়াত্ত্ব প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) লিমিটেডের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১১ হাজার ৫১২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তবে কাগজে থাকলেও কোম্পানিটির সিংহভাগ সম্পদের হদিস নেই। কয়েক বছর ধরেই নিরীক্ষাকালে সিংহভাগ সম্পদের কোনো নথিপত্র দেখাতে পারছে না কোম্পানিটি।

পিজিসিবি’র নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান আবারও কোম্পানিটির প্রায় ৫৮ শতাংশ সম্পদের ‘অস্তিত্ব ও বাজারমূল্য’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে পুনর্মূল্যায়নের কারণে গত আট বছরে ‘অস্তিত্বহীন’ ওই সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সিংহভাগ সম্পদের অস্তিত্বসহ পাঁচ বিষয়ে আপত্তির মুখে পড়েছে কোম্পানিটি।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ আর্থিক বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে প্রায় ১১ হাজার ৫১২ কোটি টাকার স্থায়ী সম্পদ (নন-কারেন্ট অ্যাসেট) দেখিয়েছে পিজিসিবি। ওই তালিকায় পরিচালন মূলধন ব্যতীত জমি, অফিস অবকাঠামো ও যানবাহনসহ অন্যান্য সম্পদের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সম্পদের মূল্য আগের আর্থিক বছরের তুলনায় প্রায় ১৭২ কোটি ২৪ লাখ টাকা বেশি। পিজিসিবি মোট সম্পদের সিংহভাগই বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) কাছ থেকে পেয়েছে। কিন্তু বিপিডিবি ও ডিপিডিসির কাছ থেকে পাওয়া ওই সম্পদের বিস্তারিত তথ্য পিজিসিবির কাছে নেই। এমনকি হস্তান্তরের সময়ের ওই সম্পদের বাস্তব উপস্থিতি ও মূল্য যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হয়নি। তার পরও ওই দুই সংস্থার দেওয়া হিসাবের ভিত্তিতেই ফি-বছর স্থায়ী সম্পদের হিসাব করছে পিজিসিবি। এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানিটির মোট সম্পদের মধ্যে প্রায় ৫৭ দশমিক ৫২ শতাংশের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

দুই নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান এ কাশেম অ্যান্ড কোংম্পানি এবং এস এফ আহমেদ অ্যান্ড কোম্পানি পিজিসিবির প্রায় আট হাজার কোটি টাকার সম্পদের হদিস পায়নি। এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে নিরীক্ষকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘কোম্পানিটি আর্থিক বিবরণীতে স্থায়ী সম্পদ তালিকায় প্রপার্টি, প্লান্ট অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট (পিপিই) হিসাবে প্রায় ১১ হাজার ৫১২ কোটি টাকার সম্পদ দেখিয়েছে। তবে ওই সম্পদের মালিকানা ও উপস্থিতির বিষয়ে বিস্তারিত নথিপত্র রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। এ কারণে বিপিডিবি ও ডিপিডিসির কাছ থেকে পাওয়া সম্পদের বর্তমান অবস্থান ও বাজারমূল্য সম্পর্কে নিরীক্ষকদের কোনো তথ্য দিতে পারেনি পিজিসিবি। ওই সম্পদের বর্তমান মূল্য, সম্পদের অধিগ্রহণ বা অর্জনের সময়কাল ও অবচয়ের হার সম্পর্কেও কোনো তথ্য পিজিসিবির কাছে নেই। এক্ষেত্রে পিজিসিবি বাংলাদেশ অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ডসের (বিএএস) এ-সংক্রান্ত নির্দেশনাও পরিপালনে ব্যর্থ হয়েছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানটি ওই আইনি নির্দেশনা বিষয়ে কোনো নীতিমালাও প্রণয়ন করেনি।’

তবে কোম্পানিটির সম্পদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন নতুন কিছু নয়। ২০১০ সালেও তৎকালীন নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান একনাবীন প্রায় তিন হাজার ৩৩৮ কোটি ৩২ লাখ টাকার স্থায়ী সম্পদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। এর পর থেকে আট বছর ধরে একই বিষয়ে আপত্তি তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে বারবারই উদ্ভূত সংকট সমাধানের আশ্বাস দিচ্ছে পিজিসিবি।

রাষ্ট্রায়াত্ত্ব প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে দেওয়া ব্যাখ্যায় কয়েক বছর ধরেই চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও প্রকৌশলী সমন্বয়ে গঠিত একটি যৌথ উদ্যোগে স্থায়ী সম্পদ ও ইনভেনটরির বাস্তবতা যাচাই কাজ করা এবং কম্পিউটারভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ওই যৌথ উদ্যোগটি ব্যর্থ হওয়ায় পিজিসিবি তাদের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করেছে। এরপর পরিচালনা পর্ষদের দিকনির্দেশনা মেনে সম্পদের তথ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

পিজিসিবির কোম্পানি সচিব মো. আশরাফ হোসেন শেয়ারবার্তাকে বলেন, ‘সম্পদের হিসাব নিয়ে নিরীক্ষকের আপত্তি এড়াতে আমরা কয়েক বছর ধরে কাজ করছি। প্রথমে বাইরের প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তারা ব্যর্থ হওয়ার পর এখন আমরা নিজস্ব জনবল দিয়েই কাজ করাচ্ছি। এরই মধ্যে আমরা সফটওয়্যার তৈরি করিয়েছি। জটিলতা শেষ করতে আরও সময় লাগবে।’

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, সম্পদের হিসাব তৈরি ও তা সংরক্ষণের জন্য এর আগে একটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মকে দায়িত্ব দিয়েছিল পিজিসিবি। কিন্তু প্রায় দুই বছর সময় নিয়েও প্রতিষ্ঠান দুটি চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করতে পারেনি। তাই ২০১৭ সালেই তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেছে পিজিসিবি। এরপর সম্পদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য সফটওয়্যার তৈরির জন্য পাইলট প্রকল্পও নেওয়া হয়েছিল। তারপরও সংকট কাটেনি। আবারও ‘আরও সময় লাগবে’ বলে জানিয়েছে পিজিসিবি।

এদিকে সম্পদের নথিপত্র সংরক্ষণ না করা ও আপত্তির মুখেও দফায় দফায় পুনর্মূল্যায়নের পাশাপাশি এবার আদায় হওয়া নিয়ে সংশয় রয়েছে এমন পাওনার বিপরীতে প্রভিশন না রাখা, আয়-মুনাফার অঙ্কে হেরফের ও গ্রাচ্যুয়িটি বিষয়ে বিদ্যমান অ্যাকাউন্টিং স্ট্যান্ডার্ড পরিপালন না করার বিষয়েও আপত্তি তুলেছেন নিরীক্ষকরা।

শেয়ারবার্তা / শহিদুল ইসলাম

সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে