ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পুঁজিবাজারের চার আর্থিক প্রতিষ্ঠান

২০১৮ নভেম্বর ০৮ ০৬:৪৮:৫৯
ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পুঁজিবাজারের চার আর্থিক প্রতিষ্ঠান

ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৪ আর্থিক প্রতিষ্ঠান। পরিচালকদের কোন্দল, অর্থ আত্মসাত ও নানা অনিয়মের কারণে কোম্পানিগুলো এখন প্রায় অস্বিত্ব সংকটের মুখোমুখি। কোম্পানিগুলোর অবস্থা এমনই নাজুক অবস্থায় রয়েছে যে কোম্পানিগুলো আমানতকারীদের টাকাও পরিশোধ করতে পারছে না। কোম্পানিগুলো হল-বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন লিমিটেড (বিআইএফসি), পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড (পিএলএফএসএল), ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেড ও প্রাইম ফাইন্যান্স লিমিটেড। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, আর্থিক খাতের এ চারটি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রাইম ফাইন্যান্স থেকে প্রায় ৫৫০ কোটি টাকা, বিআইএফসি থেকে ৫১২ কোটি টাকা, পিপলস লিজিং থেকে ৫৫০ কোটি টাকা ও ফার্স্ট ফাইন্যান্স থেকে ৩৫০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, বিআইএফসির আর্থিক অবস্থা খুবই নাজুক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠান থেকে পরিচালকরা নামে-বেনামে ৫১২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নিয়েছে। আর্থিক সংকটে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি আমানতকারীদের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। কলমানি এবং ব্যাংক থেকে যেসব স্থায়ী আমানত নিয়েছে সেগুলোও পরিশোধ করতে পারছে না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিআইএফসির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। অনিয়মের দায়ে তাকে বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালক পদ থেকে অপসারণ করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ৮৩৭ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে আবদুল মান্নান ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে পাওনা প্রায় ৬২১ কোটি টাকা। এর পুরোটাই খেলাপি। তবে সুদসহ হিসাব করলে, আবদুল মান্নানের কাছেই আটকা প্রায় ১ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। তাদের ১০ টাকা দামের শেয়ার নেমে এসেছে ৫ টাকায়। রিজার্ভ তহবিলে ঘাটতি রয়েছে ৭৭০ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে লোকসান গুনছে।

পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড আমানতকারীদের টাকা পরিশোধ করতে পারছে না। তাদের শাখাগুলোতে গ্রাহকদের ভিড় লেগেই আছে। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়েও গ্রাহকরা ভিড় করছেন।

এসব জায়গায় ধরনা দিয়েও টাকা পাচ্ছে না গ্রাহকরা। এমনকি কয়েক মাস ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও ঠিকমতো দিতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। মূলত মালিক পক্ষ জালিয়াতি করে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করায় প্রতিষ্ঠানটি ধুঁকে ধুঁকে চলছে।

টাকা রেখে ফেরত না পাওয়ার তালিকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, সাবেক সচিব, পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সুপরিচিত অনেক ব্যক্তিও রয়েছেন। এদের অনেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। এরপরও থেমে নেই পিপলস্ লিজিংয়ের আমানত সংগ্রহ।

এছাড়া অনিয়মের মাধ্যমে ফার্স্ট ফাইন্যান্স থেকেও ৩৫০ কোটি টাকা তুলে নেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের কয়েকজন। এসব টাকা ফেরত আসছে না। তাদের রিজার্ভ তহবিলে ৩৫ কোটি টাকা থাকলেও নগদ অর্থের সংকট প্রকট। তাদের ১০ টাকা দামের শেয়ার নেমে এসেছে সাড়ে ৬ টাকায়। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটি লোকসানের খাতায় নাম লিখিয়েছে।

এর বাইরে ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ১ হাজার ২১৭ কোটির মধ্যে ২২৩ কোটি টাকার বেশি ঋণখেলাপি হয়ে পড়েছে। প্রাইম ফাইন্যান্সের ১ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ৪১১ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে।

কোম্পানিগুলো আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না- এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, গ্রাহকের আমানত ফেরত দেয়া প্রতিষ্ঠানের পবিত্র দায়িত্ব। কোনো প্রতিষ্ঠান অর্থ ফেরত দিতে না পারলে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। বিষয়গুলো বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যবেক্ষণ করছে।

বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা এসব প্রতিষ্ঠান আমানত সংগ্রহে নানা উপায়ে এখনো্ টোপ দিচ্ছে আমানতকারীদের। বর্তমানে ব্যাংকগুলো যেখানে ৬ থেকে ৭ শতাংশ সুদে মেয়াদি আমানত নিচ্ছে, সেখানে এসব প্রতিষ্ঠান ১২ শতাংশ সুদে আমানতের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইলে এসএমএস দিচ্ছে। এ ছাড়া ৫ বছরে দ্বিগুণসহ আকর্ষণীয় নানা চটকদারী স্কিম নিয়ে হাজির হচ্ছে আমানতকারীদের কাছে।

শেয়ারবার্তা / শহিদুল ইসলাম

সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে