ঢাকা, শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

পুঁজিবাজারে অনাস্থার প্রধানতম কারণ ইনসাইডার ট্রেডিং

২০১৮ নভেম্বর ০৮ ০৬:০৭:০০
পুঁজিবাজারে অনাস্থার প্রধানতম কারণ ইনসাইডার ট্রেডিং

দেশের অর্থনীতিতে সব সূচকই ইতিবাচক। কিন্তু পুঁজিবাজারে তার প্রভাব নেই। এর কারণ পরিচালকদের কারসাজির বিষয়গুলো পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট তৈরি করছে। কোম্পানি তার ইপিএস ও লভ্যাংশের তথ্য প্রকাশের আগেই কিছু গোষ্ঠী এসব তথ্য জেনে যাচ্ছে। অর্থাৎ ইনসাইডার ট্রেডিং যারা করছে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এটি বন্ধ করতে না পারলে পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরবে না।বুধবার এনটিভির মার্কেট ওয়াচ অনুষ্ঠানে বিষয়টি আলোচিত হয়। মোশতাক আহমেদ সাদেকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দি ডেইলি স্টারের বিজনেস এডিটর সাজ্জাদুর রহমান, সমকালের বিজনেস এডিটর জাকির হোসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক সালাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। অনুষ্ঠানটি গ্রন্থনা ও সম্পাদনা করেন হাসিব হাসান।

সাজ্জাদুর রহমান বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক সূচক নেই বরং সবগুলো সূচক ইতিবাচক। এছাড়া কোম্পানিগুলোর ইপিএস ও লভ্যাংশের তথ্য কিছু লোকের কাছে আগেই ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। পরিচালকদের কারসাজির বিষয়গুলো পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট তৈরি করছে। ইনসাইডার ট্রেডিংয়ের বিষয়গুলো ৯৯ শতাংশ বিনিয়োগকারী জানেন না। এর জন্য ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠন করা হয়েছিল; কিন্তু এদের কোনো ভূমিকাই দেখা যায় না বাজারে। ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

পুঁজিবাজারে ইদানীং আরেকটি সমস্যা বেশি দেখা গেছে, একজনের শেয়ার আরেকজনকে উপহার হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারের মূল্য নিয়ে যে কারসাজি হয়, এর পেছনে ইস্যু ম্যানেজারসহ যারা কোম্পানিটি আনার সঙ্গে জড়িত, তাদের অনেকেই জড়িত থাকেন। এর ফলে পুঁজিবাজারে নানা ধরনের কারসাজি হচ্ছে। এতে করে সাধারণ বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পুঁজিবাজারে প্রায় ৮০ শতাংশই সাধারণ বিনিয়োগকারী। এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা যদি সঠিকভাবে নজরদারি না করে, সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পাবেন না। ২০১০ সালের পর দেশের অর্থনীতি দুই থেকে তিনগুণ বেড়েছে; সে তুলনায় পুঁজিবাজার বিপরীতমুখী। কীভাবে পুঁজিবাজারকে একটি গতিশীল বাজার করা যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
জাকির হোসেন বলেন, বর্তমানে পুঁজিবাজারে ৩০ লাখ বিনিয়োগকারী রয়েছেন, এর মধ্যে ১৩ লাখ সেকেন্ডারি মার্কেটে আর বাকি ১৭ লাখ প্রাইমারি মাকের্টে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। শুধু আইপিও’র জন্য অনেক বিও হিসাব খুলে রাখা হয়েছে, কিন্তু তারা সেকেন্ডারি মার্কেটে সেভাবে সক্রিয় নন। তারা কেন সেকেন্ডারি মার্কেটে আসছেন না। কারণ বাজারে বিনিয়োগ করার মতো কোনো কোম্পানিতে আস্থা খুঁজে পাচ্ছেন না। যে কোনো কারণেই হোক, পুঁজিবাজারে বড় ধরনের আস্থার সংকট রয়েছে বলে আমার মনে হয়।

গতকালের তথ্য অনুযায়ী অক্টোবর মাসে রফতানি গ্রোথ হয়েছে ৩০ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে হয়েছে প্রায় ১৯ শতাংশ। যা গত অর্থবছরের তুলনায় অনেক বেশি। এখন কথা হচ্ছে, নির্বাচনি বছরে রফতানি খাতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে না অথচ পুঁজিবাজারে এর প্রভাব পড়ছে এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়।

সালাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, গত ছয় থেকে সাত মাসে পুঁজিবাজারে কয়েকটি কোম্পানির শেয়ারের দাম ১০০ থেকে ২০০ শতাংশ বেড়েছে। এখন কথা হচ্ছে, বাজারে শেয়ারের দাম বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দাম বাড়ার ক্ষেত্রে কিছু কারণ থাকতে হবে। যেমন কোম্পানির আয় বাড়ছে, নতুন কোনো প্রকল্প হচ্ছে বা কোম্পানি সম্প্রসারিত হচ্ছে এ ধরনের কোনো তথ্য থাকলে সে কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়তেই পারে; কিন্তু কোনো সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েই চলেছে। কেন এসব শেয়ারের দাম বাড়ছে, এর কারণ জানতে হবে। এখানেই বিনিয়োগকারীরা বাজারের প্রতি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছেন। পুঁজিবাজারে প্রায় ৮০ শতাংশই সাধারণ বিনিয়োগকারী। তারা যদি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ না করতে পারেন, সেক্ষেত্রে বাজার কীভাবে ভালো হবে। চলতি বছরের প্রথমদিকে ছয় হাজারের বেশি সূচক ছিল; অথচ এখন তা পাঁচ হাজারে নেমে এসেছে। কিন্তু অর্থনীতির অন্যান্য সব সূচক ইতিবাচক রয়েছে, অর্থাৎ আমরা সবদিকে ভালো করছি। কিন্তু পুঁজিবাজারে এগোতে পারছি না।

পুঁজিবাজারের উন্নয়নে ডিমিউচুয়ালাইজেশন করা হয়েছে, চীনের বিখ্যাত দুই স্টক এক্সচেঞ্জ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল গঠনসহ আরও অনেক বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আসলে এখানে উদ্যোগের কোনো অভাব নেই; কিন্তু তার ইতিবাচক কোনো ফল দেখা যাচ্ছে না। পুঁজিবাজারের মূল সমস্যার মধ্যে একটি হচ্ছে ইনসাইডার ট্রেডিং। কোম্পানি তার ইপিএস ও লভ্যাংশ প্রকাশ করার আগেই তথ্যগুলো কিছু গোষ্ঠী জেনে যাচ্ছে। অর্থাৎ ইনসাইডার ট্রেডিং যারা করে, তাদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ইনসাইডার ট্রেডিং বন্ধ করতে না পারলে পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরে আসবে না।

শেয়ারবার্তা / ফারজানা রহমান

বাজার বিশ্লেষণ এর সর্বশেষ খবর

উপরে