ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

শীর্ষ ২৫ ঋণখেলাপির নতুন আবদার

২০১৮ অক্টোবর ১৩ ০৬:৪২:২৫
শীর্ষ ২৫ ঋণখেলাপির নতুন আবদার

ঋণখেলাপির তকমা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য দেশের বড় বড় অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান নীতিমালার বাইরে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে সরাসরি আবেদন করেছে। আবেদনে প্রতিষ্ঠানগুলো অনুরোধ করেছে, ঋণ পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে তারা ডাউনপেমেন্ট হিসাবে কোনো অর্থ পরিশোধ করতে পারবে না। উপরন্তু ব্যবসা সচল রাখতে যেন তাদের নতুন ঋণ প্রদানে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে নির্দেশ দেওয়া হয়। এমন দাবিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছে ২৫ কোম্পানি। এসব কোম্পানি যেসব করপোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন, সেসব প্রতিষ্ঠানের নামে সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, ইসলামী, মার্কেন্টাইল, ন্যাশনালের মতো বড় বড় ব্যাংকে রয়েছে হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

প্রসঙ্গত ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য। সামনে আসছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ জন্য ঋণখেলাপির তকমা কাটাতে তৎপর হয়ে উঠেছেন অনেকেই। এ জন্য রাজনৈতিক প্রভাবও খাটাচ্ছেন কেউ কেউ। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও নীতিমালার বাইরে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই নমনীয় আচরণ করে থাকে। আর এ সুযোগ কাজে লাগাতে তৎপর হয়ে উঠেছেন রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ছাড়াও অনেক ব্যবসায়ী। বিশ্বস্ত সূত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- মুন্নু ফেব্রিক্স, এইচআরসি সিন্ডিকেট, আনন্দ শিপইয়ার্ড, ইব্রাহী কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলস, আলভী অ্যান্ড কোং, এমএম ট্রেডার্স, ফ্রেন্ডস অ্যান্ড কোং, সাকুরা স্টিল, মেসার্স এনআর ট্রেডিং, শিল্পী কনস্ট্রাকশন, ড্যাফ চিটাগং এক্সেসরিজ, ফ্যাশন এফএক্স লিমিটেড, রকিবুল আনোয়ার হসপিটাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট, মেসার্স সাহেব আলী রাইস মিল, ড্যাফ পিপি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, সাইয়েনকি গার্মেন্টস, মরিয়ম স্পিনিং, মেসার্স বিছমিল্লাহ এন্টারপ্রাইজ, ডায়ানা গার্মেন্টস, এফজে জিও টেক্স (বিডি), বেনিসন প্যাকেজিং অ্যান্ড প্রিন্টিং, আর্থ এগ্রো ফার্মস, এনআর ট্রেডিং ও ওফাজুদ্দিন স্পিনিং মিল। এর মধ্যে জাতীয় সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকায় রয়েছে মুন্নু ফেব্রিক্স। মুন্নু গ্রুপের এই প্রতিষ্ঠানটির কাছে শুধু সোনালী ব্যাংকেরই পাওনা ৩৪০ কোটি টাকা। কেবল মুন্নু গ্রুপই নয়, এইচআরসি, নোমান ও আনন্দ গ্রুপের মতো বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকানাধীন কোম্পানিও রয়েছে এই ২৫টির মধ্যে।

ইতিপূর্বেও দেখা গেছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করে অনেক ঋণখেলাপি বড় ধরনের সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার যুক্তি দেখিয়ে ২০১৪ সালে বেক্সিমকো গ্রুপের প্রস্তাব অনুযায়ী ‘ঋণ পুনর্গঠন নীতিমালা’ করা হয়। এর পর এ নীতিমালায় ১১টি শিল্প গ্রুপের প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। এসব ঋণগ্রহীতার অধিকাংশই ঋণ পরিশোধ করছেন না। তদুপরি নামমাত্র ডাউনপেমেন্ট দিয়ে এমনকি ডাউনপেমেন্ট না দিয়েও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ নিয়মিত করে নেওয়ার রেকর্ডও রয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, পুনঃতফসিলের জন্য কোনো গ্রাহকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বরাবর সরাসরি আবেদন করার সুযোগ নেই। গ্রাহকের পক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক আবেদন করবে। এ বিষয়টি আবেদনকারীদের কাছে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হবে।
নিয়মানুযায়ী গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক নিজেই পুনঃতফসিল করে দিতে পারে। এ জন্য নীতিমালা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ধার্যকৃত ন্যূনতম পরিমাণ অর্থ নগদ (ডাউনপেমেন্ট) পরিশোধ করতে হয়। ওই নীতিমালা অনুসারে, প্রথমবার পুনঃতফসিলের জন্য বকেয়া কিস্তির ১৫ শতাংশ বা মোট পাওনার ১০ শতাংশের মধ্যে যেটি কম, সেই পরিমাণ নগদ অর্থ; দ্বিতীয়বারের ক্ষেত্রে বকেয়া কিস্তির ৩০ শতাংশ বা মোট পাওনার ২০ শতাংশের মধ্যে যেটি কম; তৃতীয়বার বকেয়া কিস্তির ৫০ শতাংশ বা মোট পাওনার ৩০ শতাংশের মধ্যে যেটি কম সেই পরিমাণ নগদ অর্থ জমা দিতে হয়।
সাম্প্রতিককালে দেখা গেছে, এই নীতিমালা প্রায় অকার্যকর। নীতিমালার বাইরে গিয়ে পুনঃতফসিল সুবিধা গ্রহণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করছে ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানগুলো।

আবেদনকারী গ্রুপগুলো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক দুরবস্থাসহ বিভিন্ন কারণ তুলে ধরে জানিয়েছে, এ মুহূর্তে তাদের পক্ষে ঋণের অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়। পুনঃতফসিলের ক্ষেত্রে ডাউনপেমেন্ট দেওয়ার সামর্থ্য পর্যন্ত তাদের নেই। অন্যদিকে নতুন করে ঋণ না পেলে ব্যবসা করাও অসম্ভব। তাই খেলাপি ঋণ নিয়মিত করে তাদের যেন নতুন ঋণ প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে করা ওই আবেদনে আরও অনুরোধ করা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে কর্তৃপক্ষ যেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে পুনঃতফসিল করার নির্দেশ দেয় এবং প্রয়োজনীয় ঋণের যোগান দিতে ব্যাংকগুলোকে আদেশ দেয়।

আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আনন্দ শিপইয়ার্ডের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৬শ কোটি টাকা। ইসলামী ব্যাংকে ৬৪৩ কোটি, এবি ব্যাংকে ১৮৬ কোটি, ওয়ান ব্যাংকে ২২৭ কোটি, জনতা ব্যাংকে ২৩৮ কোটি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডে (বিডিবিএল) ২৪ কোটি ও এনসিসি ব্যাংকে ১৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে গ্রুপটির। এর বাইরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকেও ঋণ রয়েছে ১২০ কোটি টাকা।
এদিকে ওয়েবসাইট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নোমান গ্রুপের প্রতিষ্ঠান মরিয়ম স্পিনিং মিল। ইসলামী ব্যাংকে এ গ্রুপের ঋণ রয়েছে ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের বড় গ্রাহক এই গ্রুপটি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র জানায়, ঋণখেলাপি গ্রুপগুলো অনেক কৌশলী। কৌশলের ফাঁদে ফেলে তারা বছরের পর বছর ঋণের টাকা আটকে রাখছে। ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ না করেই তারা সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আবেদন করেছে। অথচ নীতিমালা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে তাদের আবেদন করার কথা।


শেয়ারবার্তা / শহিদুল ইসলাম

অনুসন্ধানী রিপোর্ট এর সর্বশেষ খবর

উপরে