ঢাকা, শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮, ৫ কার্তিক ১৪২৫

বেড়েই চলছে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ

২০১৮ সেপ্টেম্বর ১৪ ০৬:২৪:২২
বেড়েই চলছে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ

সঞ্চয়পত্রের সুদহার ব্যাংক আমানতের সুদের চেয়ে বেশি হওয়ায় বেড়েই চলেছে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি। সঞ্চয়পত্র কিনতে ব্যাংক, সঞ্চয় ব্যুরো ও ডাকঘরগুলোয় ভিড় লেগেই আছে। সাধারণ মানুষকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় আহরণের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আকারে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হলেও এখন তা চলে যাচ্ছে বিত্তবানদের দখলে। আর বিত্তবানরা বেশি অর্থ বিনিয়োগ করার সামর্থ্য রাখায় এর বিক্রি বাড়ছে দ্রুতগতিতে। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয় আট হাজার ২২৯ কোটি টাকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের জুলাই শেষে দেশের বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে গড়ে ছয় দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ সুদ দিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে গড়ে চার দশমিক ২৬ শতাংশ সুদ দিয়েছে। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রগুলোর মধ্যে পাঁচ বছরমেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের মেয়াদ শেষে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ মুনাফা পাওয়া যায়। পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের মুনাফা ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। তিন বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার ১১ দশমিক শূন্য চার শতাংশ। তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার বর্তমানে ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। ফলে হিসাবি ও নির্ঝঞ্ঝাট মানুষেরা ব্যাংক থেকে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ভাঙিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনছেন বলে জানা গেছে। ফলে ব্যাংকের তহবিলেও টান পড়ছে।

আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে ব্যাংকে আমানত রেখে যে সুদ পাওয়া যাচ্ছে তার দ্বিগুণ মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে সঞ্চয়পত্রে। অন্যদিকে শেয়ারবাজার ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও খারাপ অবস্থা। এ কারণেই সঞ্চয়পত্রে ঝুঁকছেন আমানতকারীরা। তাদের মতে, স্বল্প আয়ের মানুষ ও পেনশনভোগীদের কাছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করার কথা থাকলেও বর্তমানে সঞ্চয়পত্র কিনছেন বিত্তবানরাই।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে আট হাজার ২২৯ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করেছে সরকার। আলোচ্য সময়ে মুনাফা বাবদ সরকারের ব্যয় হয়েছে এক হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। জুলাইয়ে সঞ্চয়পত্র নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর আগে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ১২ মাসে মোট ৭৮ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে মূল ও মুনাফা বাবদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ৩২ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা। আর শুধু মুনাফা পরিশোধ করা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় দুই কোটি।

জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সঞ্চয়পত্রের স্কিমগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিরক্ষা সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র, তিন বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র, বোনাস সঞ্চয়পত্র, ছয় মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, পরিবার সঞ্চয়পত্র, তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র, জামানত সঞ্চয়পত্র, পেনশনার সঞ্চয়পত্র, পোস্ট অফিস সেভিংস ব্যাংকÑযার মধ্যে রয়েছে সাধারণ হিসাব, মেয়াদি হিসাব ও বোনাস হিসাব, ডাক জীবন বীমা, বাংলাদেশ প্রাইজবন্ড, ওয়েজ অর্নার ডেভেলপমেন্ট বন্ড, তিন বছর মেয়াদি জাতীয় বিনিয়োগ বন্ড, ইউএস ডলার প্রিমিয়াম বন্ড ও ইউএস ডলার ইনভেস্টমেন্ট বন্ড।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমানতের সুদহার কমার ফলেই যে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি বাড়ছে, তেমনটা নয়। ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতির কারণেই ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা কমছে। প্রকৃত সঞ্চয়ভোগীদের জন্য সঞ্চয়পত্রের সুদ ঠিক আছে। তবে যদি সরকারি বড় কর্মকর্তা ও বিত্তবানরাই সঞ্চয়পত্রের ক্রেতা হয়ে থাকে, সেটা সরকারকে বন্ধ করতে হবে। তা না হলে এটা সরকারের বড় দুর্বলতা।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, এটা তো স্বাভাবিকভাবেই বোঝা যায় ব্যাংক আমানতের সুদহার কম থাকলে সবাই সঞ্চয়পত্রের দিকেই ঝুঁকতে চাইবে। সেটাই হচ্ছে এখন।

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত জানিয়েছেন, আগামী নির্বাচনের আগে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমছে না। সঞ্চয়পত্রের সুদহার সমন্বয় করতে একটা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি আগামী দুই মাসের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট দেবে।

শেয়ারবার্তা / শহিদুল ইসলাম

সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে