ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ৫ পৌষ ১৪২৫

ব্যাংক খাতে আবারও লাগামহীন খেলাপি ঋণ

২০১৮ সেপ্টেম্বর ১১ ০৬:২৪:৫২
ব্যাংক খাতে আবারও লাগামহীন খেলাপি ঋণ

ব্যাংক খাতে আবারও লাগামহীন খেলাপি ঋণ হয়ে পড়ছে। কোনভাবেই খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। পুনঃতফসিল করে গত বছরের শেষদিকে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমিয়ে এনেছিল দেশের ব্যাংকগুলো। তবে ছয় মাস যেতে না যেতেই পুরোনো চেহারায় ফিরেছে খেলাপি ঋণ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫ হাজার ৩৭ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাস শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ। জুন প্রান্তিক শেষে ৫৭টি ব্যাংকের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আট লাখ ৫৮ হাজার ৫২১ কোটি টাকা। এছাড়া স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আদায় অযোগ্য হয়ে পড়ায় গত ডিসেম্বর পর্যন্ত মামলাভুক্ত হয়েছে ৫৫ হাজার ৩১১ কোটি টাকার অবলোপনকৃত খেলাপি ঋণ। এ ঋণ যোগ করলে দেশের ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক লাখ ৪৪ হাজার ৬৫১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। এছাড়া পুনঃতফসিল করা হয়েছে ৮৪ হাজার কোটি টাকা, পুনর্গঠন করা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণখেলাপি হয়ে যাচ্ছে।

তথ্যমতে, মোট খেলাপি ঋণের অর্ধেকই রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংকের। অবশ্য আগের প্রান্তিকের তুলনায় এ ব্যাংকগুলোর খেলাপি কিছুটা কমেছে। জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ। এ সময় ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণ ছিল এক লাখ ৫১ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা। আর মার্চ শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৪৩ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ। ওই সময় ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণকৃত ঋণ ছিল এক লাখ ৪৬ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। গত ডি?সেম্ব?র শেষে এসব ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি ছিল এক লাখ ৪০ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৭ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ২৬ দশমিক ৫২ শতাংশ।

বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ২৪১ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এ সময় তাদের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা। মার্চ শেষে বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল পাঁচ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এ সময়ে এই দুই ব্যাংকের ঋণের স্থিতি ছিল ২৩ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকেও একই পরিমাণ ছিল।

অন্যদিকে, খেলাপি ঋণ বেড়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর। জুন শেষে ৪০টি বেসরকারি ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৮ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৩৮ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ছয় দশমিক শূন্য এক শতাংশ। গত মার্চে বেসরকারি খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ৩৭ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ছয় শতাংশ। ওই সময়ে মোট ঋণের স্থিতি ছিল ছয় লাখ ২১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ৪০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণ করা ঋণের চার দশমিক ৮৭ শতাংশ। ডিসেম্বর শেষে ঋণ বিতরণ করে ছয় লাখ তিন হাজার ৬০৩ কোটি টাকা।

দেশে পরিচালিত ৯টি বিদেশি মালিকানার ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ছয় দশমিক ৬৬ শতাংশ। জুন শেষে তাদের মোট ঋণ ৩৪ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ দুই হাজার ২৭১ কোটি টাকা। মার্চ শেষে এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দুই হাজার ১৮৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের সাত দশমিক শূন্য এক শতাংশ। মোট ঋণের পরিমাণ ৩১ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। ডিসেম্বর শেষে দুই হাজার ১৫৪ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ ছিল, যা মোট ঋণের সাত দশমিক শূন্য চার শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ছিল ওই সময় ৩০ হাজার ৬২২ কোটি টাকা।

আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, আর্থিক অবস্থা ভালো দেখাতে ডিসেম্বরে বাছবিচার ছাড়াই সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করেছে। কিন্তু, জুনে এসে পুনঃতফসিলকৃত ঋণসহ নতুন ঋণও খেলাপি হয়ে পড়েছে। এছাড়া বিশেষ সুবিধায় ২০১৫ সালে পুনর্গঠন করা ঋণের বড় একটি অংশও এখন খেলাপি। সব মিলিয়ে জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সুশাসনের অভাবে ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতি জেঁকে বসেছে। পরিচালকরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চান। তাদের কারণে এমডিরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। আবার ব্যাংকারদের একাংশের অযোগ্যতা-দুর্বলতার কারণেও সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। পরিস্থিতি উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও কঠোর হতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে নিজেদের উদ্যোগ ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংকের পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ঋণ বিতরণের সময় মান যাচাই করতে হবে।


শেয়ারবার্তা / শহিদুল ইসলাম

অনুসন্ধানী রিপোর্ট এর সর্বশেষ খবর

উপরে