ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৯ কার্তিক ১৪২৬

লিভার ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, জেনে নিন কিভাবে লিভার নিরাপদ রাখবেন-

২০১৮ জুলাই ১৪ ১৫:৪০:১৫
লিভার ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, জেনে নিন কিভাবে লিভার নিরাপদ রাখবেন-

লিভার রোগ মানেই যেন আঁৎকে উঠা। অন্য কোন রোগে যেমন-তেমন, লিভারে অসুখ হয়েছে মনে করলেই মনে নানা অজানা আশঙ্কা উঁকি-ঝুঁকি দেয়। আর চারপাশের সবাই হয়ে উঠেন একেকজন লিভার বিশেষজ্ঞ। এটা করতে হবে, ওটা করোনা জাতীয় পরামর্শ আসতে থাকে ক্রমাগত। লিভার মানবদেহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। তবে কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ, এ বিষয়ে কথা বলেছেন ডা. এ কে এম শামসুল কবীর।

প্রশ্ন : লিভার এত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কেন?

উত্তর : আসলে লিভারকে বলা হয় পাওয়ার হাউস অব দ্য হিউম্যান বডি। একটি বাসায় ইলেকট্রিসিটি চলে গেলে যেমন জেনারেটর অন হয়ে যায়, তেমনি শরীরের ক্ষেত্রে লিভার জেনারেটর হিসেবে কাজ করে। শরীরে গুরুত্বপূর্ণ হরমোন তৈরি করে। প্রয়োজনীয় মুহূর্তে খাবারের ঘাটতি ঘটলে, গ্লুকোজের ঘাটতি ঘটলে লিভার থেকে সরবরাহ দেওয়া হয়। যেকোনো দূষিত পদার্থ শরীরে প্রবেশ করলে লিভার একে ডিটোক্সিফাই করে।

যেকোনো জীবাণু যদি খাবার বা রক্তের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে, লিভার একে দূরীভূত করার চেষ্টা করে। পাশাপাশি অন্য কিছু অঙ্গ কিন্তু লিভারের কার্যক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। সর্বোপরি শরীরে যত এনার্জি, সবকিছুর জায়গা হচ্ছে লিভার। মেটাবলিজম, হজম সেগুলো লিভারেরই কাজ। মজার বিষয় হলো, লিভারকে সৃষ্টিকর্তা এমন শক্তি দিয়ে তৈরি করেছেন যে একটি লিভারকে যদি আমরা ছয় ভাগে ভাগ করি, পাঁচ ভাগ যদি কাজ না করে তাও এক ভাগ স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে। অনেক মানুষ জানেনই না, লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বসে রয়েছে। তবে তাঁরা কিন্তু বেঁচে আছেন।

প্রশ্ন : লিভারের বেলায় সাধারণত কতটুকু চর্বি থাকতে পারে?

উত্তর : এর কোনো সঠিক পরিমাপ নেই। যে বা যিনি ফ্যাটি লিভার নির্ণয় করেন তিনি গ্রেড ওয়ান, গ্রেড টু, গ্রেড ফোর এভাবে ভাগ করেন। লিভারে কিছু চর্বি তো থাকতেই হবে, শক্তি তৈরির জন্য, হরমোন তৈরির জন্য, তবে সেটি যখন একটি নির্দিষ্ট মাত্রা অতিক্রম করে, তখন লিভারকে অমসৃণ দেখায়। সাদা সাদা ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায় সেখানে। তখনই একজন সোনোগ্রাফির চিকিৎসক বলেন, ‘এটি স্বাভাবিক নয়। এটি ফ্যাটি লিভার।’

প্রশ্ন : ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় শুরুতে কি কোনো লক্ষণ ধরা পড়ে?

উত্তর : আসলে কখনোই শুরুতে লক্ষণ ধরা পড়ে না। অনেক সময় অগ্রবর্তী পর্যায় গিয়ে ধরা পড়ে। খুবই মজার বিষয় হলো, ফ্যাটি লিভার দৃশ্যমান হয় একজন সোনোগ্রাফারের কাছে। একজন মানুষ হয়তো তার রুটিন চেকআপের জন্য বছরে একবার আলট্রাসনোগ্রাফি করে বা অন্য কোনো কারণে তাকে আলট্রাসনোগ্রাফি করতে পাঠানো হলো, দেখা গেল তার লিভারে চর্বি জমে বসে আছে। তখনই কিন্তু বের হয় যে তার ফ্যাটি লিভার রয়েছে।

আমরা অন্যান্য অনেক পরীক্ষাই রুটিনমাফিক করি। যেমন কিডনি বা কোলেস্টেরল নির্ণয়। তবে সাধারণ লিভারের পরীক্ষা রুটিনমাফিক করি না। তবে ইদানীং মানুষের মাঝে সচেতনতা বেড়ে যাওয়াতে ফ্যাটি লিভারের রোগটা সামনে আসাতে আমরা সবাই বিষয়টি নিয়ে একটু সচেতন। তবে এর তো আসলে অনেক কারণ রয়েছে।

প্রশ্ন : লিভারে চর্বি জমে গেলে বা ফ্যাটি লিভার হলে ক্ষতি কী।


উত্তর : লিভারে চর্বি জমলে আগে অনেক চিকিৎসক বলতেন, ‘এটি কোনো সমস্যা নয়’। তবে এখন দেখা যাচ্ছে যে ফ্যাটি লিভার বেশ খারাপ একটি রোগ। লিভার সিরোসিসের অন্যতম কারণ এটি। আমরা একটি সময় বলতাম যে কিছু কিছু লিভার সিরোসিসের কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

সেটা হলো ক্রিপ্টোজেনিক সিরোসিস বা লুকায়িত লিভারের রোগ, যার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে একাধিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, যে লিভারের সিরোসিসগুলোকে আমরা বলতাম লুকায়িত সিরোসিস সেগুলো আসলে ফ্যাটি লিভারের কারণে হতো। এই জন্য ফ্যাটি লিভারের সমস্যাটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া প্রয়োজন। ধরেন, এই ঘরের মধ্যে যদি ১০০ জন ফ্যাটি লিভারের রোগীকে একত্রিত করা হয়, এই ১০০ জনের মধ্যে ২০ জনের ২০ বছরের মধ্যে লিভার সিরোসিস হবে। এই জন্য এটি এত গুরুত্বপূর্ণ। সিরোসিস হলে তো লিভার ট্রান্সপ্ল্যানটেশন বা দীর্ঘদিনের চিকিৎসা করতে হয়।

প্রশ্ন : একজন লোকের লিভারে চর্বি যদি পরিমাণে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে, সেটি লিভারের কার্যক্ষমতাকে ব্যাহত করে। সেটি কীভাবে।


উত্তর : এটা বলার আগে জানতে হবে ফ্যাটি লিভার কেন হয়? সাধারণত একজন মানুষ স্থূল হলেই কিন্তু ফ্যাটি লিভার হবে না। স্বাভাবিক হওয়ার পরেও কিন্তু ফ্যাটি লিভার হতে পারে। এর এক নম্বর কারণ হলো, অতিরিক্ত মদ্যাপান। দ্বিতীয় হলো, কারো যদি ডায়াবেটিস থাকে বা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত আরো কোনো মেটাবলিক রোগ থাকে, যেমন : হেপাটাইটিস বি ও সি বলে দুটো জীবাণু রয়েছে এগুলো যখন তাৎক্ষণিকভাবে লিভারে কোনো আঘাত করে তখন হতে পারে। তখন দৃশ্যটা দেখা যায় ফ্যাটি লিভারের মতো।

অনেক সময় নারীরা দীর্ঘদিন জন্মনিয়ন্ত্রক পিল খান। এটিও কিন্তু ফ্যাটি লিভারের কারণ। কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। রক্তের মধ্যে ট্রাই গ্লিসারিন হয়ে গেলে ফ্যাটি লিভার হতে পারে। এখন লিভার যেহেতু বিপাকীয় কাজের প্রধান অঙ্গ, তাই ফ্যাটি লিভার হলে কিছু লক্ষণ প্রকাশ পাবে। একটি হলো ক্লান্তিভাব। হঠাৎ করে সে খেয়াল করবে শরীর খুব দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে। যেকোনো কাজ করতে গেলে হাঁপিয়ে যাচ্ছে, দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। একটি পর্যায়ে যদি এটি খারাপের দিকে যায় তাহলে পায়ে পেটে পানি চলে আসে। আবার খুব বেশি খারাপের দিকে গেলে রক্ত বমি হতে পারে, রক্ত পায়খানা হতে পারে।

এই সমস্যাগুলো তৈরি না হওয়ার আগে কিন্তু একজন রোগী কখনো চিকিৎসকের কাছে আসেন না। অসময়ে ঘুম পাওয়া কিন্তু ফ্যাটি লিভারের অন্যতম একটি লক্ষণ। যেসব কারণের কথা বললাম সেগুলো যদি কারো মধ্যে থাকে, আর সে যদি এই লক্ষণগুলো নিজের মধ্যে দেখেন তাহলে তার দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। এই জিনিসগুলো যদি কারো মধ্যে থাকে এবং সে যদি এই লক্ষণগুলো নিজের মধ্যে দেখে, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত।

চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধ: লিভার সিরোসিসে সেরে ওঠার সম্ভাবনা ক্ষীণ। মাত্র ২৫ শতাংশ রোগী পাঁচ বছরের বেশি সময় বেঁচে থাকার আশা করতে পারেন। সিরোসিস থেকে যকৃতের ক্যানসারেও রূপ নিতে পারে। তাই রোগ হওয়ার আগে প্রতিরোধ করাই ভালো। হেপাটাইটিস বি ও সি সংক্রমণ থেকে বাঁচতে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, যেমন শিরায় নেশাদ্রব্য ব্যবহার, অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ বা ঝুঁকিপূর্ণ যৌন সম্পর্ক এড়িয়ে চলুন।

যাঁরা হেপাটাইটিস বি নেগেটিভে আক্রান্ত, তাঁরা সংক্রমণ এড়াতে টিকা দিয়ে নিতে পারেন। অতিরিক্ত অ্যালকোহল পান এড়িয়ে চলুন। হেপাটাইটিসে সংক্রমণ হলে ঝাড়ফুঁক-জাতীয় চিকিৎসা না করে দ্রুত বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা নিন।  মেডিসিন বিভাগ, ইউনাইটেড হাসপাতাল।

শেয়ার বার্তা/ জে ভি

লাইফস্টাইল এর সর্বশেষ খবর

উপরে