ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮, ৪ পৌষ ১৪২৫

'বিএসইসিকে নিয়ন্ত্রক হিসাবে নয়, ফেসিলেটর হিসাবে দেখতে চাই'

২০১৮ মে ২২ ১২:২৯:১৫
'বিএসইসিকে নিয়ন্ত্রক হিসাবে নয়, ফেসিলেটর হিসাবে দেখতে চাই'

নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে শুরু করে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ সময় দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা তানিয়া শারমিন বর্তমানে মার্চেন্ট ব্যাংক সিএপিএম অ্যাডভাইজরি লিমিটেডে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন। গত এক দশক ধরে আর্থিক খাতে তার কাজের অভিজ্ঞতা বর্ণনাতীত। বর্তমান দায়িত্ব পালনের আগে তিনি বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড একচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), ঢাকা স্টক একচেঞ্জ (ডিএসই), ব্র্যাক ইপিএল স্টক ব্রোকারেজ, এনসিসি ব্যাংক সিকিউরিটিজ এবং ইম্পেরিয়াল ক্যাপিটাল লিমিটেডে কাজ করেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে কমপ্লায়েন্স ও মনিটরিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বর্তমানে সেকেন্ডারী মার্কেটের সঙ্গে মূলধন উত্তোলন অর্থাৎ আইপিও নিয়েও কাজ করছেন। সম্প্রতি আইপিও এবং শেয়ারবাজারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন স্টাফ রিপোর্টার রেজোয়ান আহমেদ।

ইস্যু ম্যানেজার হিসাবে সবচেয়ে বেশি কি সমস্যার সম্মুখীন হন?

তানিয়া শারমিন : দেখেন একটা কোম্পানির ফাইল সাবমিট করার পরেও আইপিও পেতে ১.৫-২ বছর লেগে যায়। এর আগে ফাইল সাবমিটের জন্য একটা কোম্পানিকে প্রস্তুত করতে ১ বছর সময় লাগে। এছাড়া আইপিও অনুমোদনের পরে শেয়ার বিও’তে পাঠানোর জন্য সিডিবিএল ও শেয়ার লেনদেন শুরু করার জন্য ডিএসইতে দৌড়াতে হয়। সবমিলিয়ে আইপিও’তে এই দীর্ঘসূত্রিতা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাড়িঁয়েছে। এটা শুধু আমাদের না, প্রত্যেক ইস্যু ম্যানেজারের সমস্যা। যা শেয়ারবাজারের জন্য নেতিবাচক।

এই দীর্ঘসূত্রিতার কারনে কি সমস্যায় পড়তে হয়?

তানিয়া শারমিন : এমনিতেই বাংলাদেশের অধিকাংশ কোম্পানি পারিবারিক। এরা শেয়ারবাজারে আসতে চায় না। অনেক বুঝিয়ে আনতে হয়। এরপরে যখন দীর্ঘ সময় লাগে, তখন কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনাস্থা তৈরী হয়। এই কালক্ষেপনের কারনে অনেক সময় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ তাদের ফাইল তুলে নেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে।

এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে করণীয় কি বলে মনে করেন?

তানিয়া শারমিন : অবশ্যই আইপিও অনুমোদনে সময়ের ব্যবধান কমিয়ে আনতে হবে। এই সময় ৬ মাসের মধ্যে আনা দরকার। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কোয়ারি দেওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন হতে পারে। কারন যেকোন ফাইলে ছোট খাট সমস্যা থাকতে পারে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এমন কিছু সমস্যা নিয়ে কোয়ারি করে, যা না করলেও কোন সমস্যা নাই। তাহলে ইস্যু ম্যানেজার ও ইস্যুয়ার উভয়ের মধ্যে আস্থা বাড়বে। যার প্রতিফলন ঘটবে শেয়ারবাজারে।

দূর্বল কোম্পানি আনতে ইস্যু ম্যানেজাররা সহযোগিতা করে এমন সমালোচনাকে কিভাবে দেখেন?

তানিয়া শারমিন : একটি কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে প্রায় ২ বছর সময় লাগে। এই দীর্ঘ সময় ধরে ডিএসই, সিএসই ও বিএসইসি বিভিন্ন বিষয়ে তদারকি করে। যদি দূর্বল কোম্পানি আসত, তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ২ বছর ধরে যাছাই শেষে আইপিও অনুমোদন দিত না। আর দূর্বল কোম্পানি আনার প্রশ্নই আসে না। হয়তো শেয়ারবাজারে আসার পরে কিছু কোম্পানি দূর্বল হতে পারে। এমনটি হওয়া অস্বাভাবিক না।

ইন্দো-বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস শেয়ারবাজারে আসার আগেই ঋণ খেলাপিসহ কিছু ইস্যুতে বিতর্কিত হয়ে পড়েছে। কোম্পানিটির ইস্যু ম্যানেজার হিসাবে এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কি?

তানিয়া শারমিন : ঋণ খেলাপি হওয়ার কোন সুযোগ নাই। দেশে যত অনিয়ম করা সম্ভব হক না কেনো, কোন ঋণ খেলাপির সিআইবি ক্লিয়ারেন্স পাওয়া সম্ভব না। আমরা এই কোম্পানিটির ২-৩ বার সিআইবি জমা দিয়েছি। ইস্যু ম্যানেজার হিসাবে ডিউ ডেলিজেন্সও দিয়েছি।

ইস্যু ম্যানেজাররা কতটুকু প্রফেশনাল?

তানিয়া শারমিন : সিএপিএম অ্যাডভাইজারি শতভাগ প্রফেশনাল। অন্যদের কথা বলতে পারি না।

দেশের সিটি গ্রুপ, আকিজ গ্রপের মতো বড় ও ভালো কোম্পানি শেয়ারবাজারে কেনো আসতে চায় না বলে মনে করেন?

তানিয়া শারমিন : সবচেয়ে বড় সমস্যা হল পারিবারিক কেন্দ্রীক কোম্পানি। এসব কোম্পানিকে মালিকপক্ষ পারিবারের বাহিরে নিতে চায় না। শেয়ারবাজারে গেলে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলবে বলে মনে করে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সুশাষণ (সিজিজি), বিভিন্ন কমপ্লায়েন্স মানতে চায় না। যা শেয়ারবাজারে আসলে মানতে হয়। তবে কোম্পানিগুলোর এমন আচরন ঠিক না।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে তো অনেক সুবিধা আছে?

তানিয়া শারমিন : শেয়ারবাজারে আসলে বিভিন্ন সুবিধা থাকা সত্ত্বেও অনেক কোম্পানি আসতে চায় না। এখানে আসলে কর রেয়াত সুবিধা, পরিচিতি, সুনাম এবং বাজারজাকরন বাড়ে। এছাড়া শেয়ারবাজার থেকে টাকা নিলে, ঋণের ন্যায় নিয়মিত সুদ প্রদানের বাধ্যবাধকতা নাই। আর উদ্যোক্তা/পরিচালকেরা তাদের প্রয়োজনে শেয়ারও সহজেই বিক্রয় করতে পারে। তারপরেও আসতে চায় না।

বিনিয়োগকারীদের সচেতন করার জন্য বিএসইসির ‘বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম’ কতটুকু ভূমিকা রাখছে?

তানিয়া শারমিন : বিনিয়োগকারীরা আগের থেকে অনেক শিক্ষিত ও সচেতন হয়েছে। তারা এখন কোম্পানির খোঁজ খবর রাখে। তারপরেও অধিকাংশ বিনিয়োগকারীরা এখনো বিভিন্ন মাধ্যমে আইটেম খুজে বেড়ায়। এটা দুঃখজনক।

কোন কোম্পানির অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধিতে ডিএসই থেকে এর কারন জানতে চাওয়াকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

তানিয়া শারমিন : ডিএসইর কারন অনুসন্ধান করা অবশ্যই ভালো। তবে ডিএসই সেটা একপাক্ষিক করে থাকে। কারন তারা কোন কোম্পানির অস্বাভাবিক দর কমা নিয়ে অনুসন্ধান করে না। অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি ও হ্রাস উভয়ক্ষেত্রেই ডিএসইর তদন্ত করা উচিত। অন্যথায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এছাড়া ব্রোকারদের মধ্যে ভয় কাজ করে।

শেয়ারবাজারের বর্তমান অবস্থায় ইস্যু ম্যানেজারদের ব্যবসায় কেমন চলছে?

তানিয়া শারমিন : এমনিতে ইস্যু আনতে সময় লাগে বেশি। এর উপরে আবার শেয়ারবাজারে নেতিবাচক অবস্থা। এছাড়া আমাদের আবার কর হার ৩৫ শতাংশ। এই সব মিলিয়ে কোনভাবে টিকে থাক আর কি। এই কর হার না কমালে টিকে থাকা দায় হয়ে দাড়াবে। অবশ্যই কর হার কমানো উচিত।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি কর্তৃপক্ষের আচরনে অনেকেই আড়ালে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। কিন্তু ভয়ে কিছু বলেন না। এটাকে কিভাবে দেখেন?

তানিয়া শারমিন : আমি ৭ বছর বিএসইসিতে ছিলাম। কখনো কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছি বলে মনে পড়ে না। তবে এখন অনেক জুনিয়র কর্মকর্তারাও নাকি চোখ রাঙ্গানি দিয়ে কথা বলে। অবশ্যই তাদের ব্যবহার সুন্দর করা উচিত। আমরা বিএসইসিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসাবে নয়, ফেসিলেটর হিসাবে দেখতে চাই।

সিএপিএম অ্যাডভাইজারীর ব্যবসায়িক অবস্থা কেমন চলছে?

তানিয়া শারমিন : ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ব্যবসায় মুনাফা হয়েছিল। আর ওই বছর প্রথমবারের মতো লভ্যাংশ দিয়েছিলাম। আশা করি ২০১৭-১৮ অর্থবছরেও লভ্যাংশ দেবো। তবে এরপরে কি হবে জানি না।

সিএপিএম অ্যাডভাইজারি থেকে বিনিয়োগকারীদের বিশেষ কোন সেবা দেন?

তানিয়া শারমিন : আমরা গ্রাহকদেরকে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। তাদের জন্য শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ে সাধারন সুবিধার পাশাপাশি মহিলাদের জন্য বিশেষ প্রডাক্ট, ছোট বিনিয়োগ ইত্যাদি সুযোগ রয়েছে।

ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।

তানিয়া শারমিন : আপনাকেও ধন্যবাদ।

শেয়ার বার্তা/ জে ভি

সাক্ষাৎকার এর সর্বশেষ খবর

উপরে