ঢাকা, সোমবার, ২২ অক্টোবর ২০১৮, ৭ কার্তিক ১৪২৫

৬২৯ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে বিপাকে রূপালী ব্যাংক

২০১৮ মে ১৬ ০৫:৪৩:৪৩
৬২৯ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে বিপাকে রূপালী ব্যাংক

একটি গ্রুপকে ৬২৯ ঋণ দিয়ে বড় ধরনের বিপাকে আছে পুঁজিবাজারে তালিকাভূক্ত রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংক রূপালী ব্যাংক। নূরজাহার গ্রুপের কাছে ব্যাংকের ৬২৯ কোটি টাকা পাওনা থাকলেও দুবছরে একটি টাকাও আদায় করতে পারেনি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক পুরোনো ঋণ আদায়ে তাগিদ দিলেও তা কোনো কাজে আসেনি। এদিকে নূরজাহান গ্রুপ আদৌ ঋণ পরিশোধ করতে পারবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত না থাকায় ঋণের বড় অংশ কোনোভাবেই আদায় করা সম্ভব হবে না বলে জানা গেছে।

ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০১০ সাল থেকে নূরজাহান গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে রূপালী ব্যাংক ঋণ দেয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। সাত বছরে সুদাসলে এ টাকা বেড়ে প্রায় সাড়ে ৬২৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে মারবিন ভেজিটেবল অয়েলের কাছে প্রায় ২৫৯ কোটি, জাসমির ভেজিটেবলের কাছে ২৩৩ কোটি, নূরজাহান সুপার অয়েলের কাছে ৮৭ কোটি ও নূরজাহান সানফ্লাওয়ার মিলের কাছে ৫০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। টাকা আদায়ে ২০১৬ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতে মামলা করে রূপালী ব্যাংক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নূরজাহান গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠানগুলোয় সীমিত পরিসরে চলছে উৎপাদন কার্যক্রম। অর্থাভাবে কারখানার চাকা চালু রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সক্ষমতার পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ উৎপাদন করে গ্রুপটি ভোজ্য তেলের বাজারে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখলেও ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা নেই। এ বিষয়ে গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমেদ শেয়ার বিজকে বলেন, তেল ও ময়দার কোম্পানিগুলোয় আগে যেখানে মাসে ২৬ দিন কাজ চলত, এখন পাঁচ দিন কাজ চলে। সীমিত আকারে উৎপাদন চলছে। প্যাকেটের গায়ে কোম্পানির নাম থাকে না; তবে চট্টগ্রামে পাইকারিভাবে বাজারজাত করা হচ্ছে।

ব্যাংক সূত্রমতে, ২০১০ সাল থেকে রূপালী ব্যাংক নূরজাহান গ্রুপকে বিশেষ ঋণ সুবিধা দেয়। ফলশ্রুতিতে বেড়েছে ঋণের পরিমাণও। ঋণ আদায়ে ব্যাংকের উদাসীনতা ছিল বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে। ব্যাংক একাধিকবার পুনঃতফসিল সুবিধাও দিয়েছে তাদের। কিন্তু নূরজাহান গ্রুপের আর্থিক ভিত্তি এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে, ২০১৫ সালে দ্বিতীয়বার পুনঃতফসিলের অনুমোদন পেয়েও কিস্তি প্রদানে ব্যর্থ হয়। সমঝোতায় কালক্ষেপণের পর রূপালী ব্যাংক মামলার পথ বেছে নিলেও আইনের ফাঁদে আটকে যায় টাকা আদায় কার্যক্রম।

এদিকে নূরজাহান গ্রুপকে ঋণ প্রদানে রূপালী ব্যাংকের অদক্ষতা ও অনিয়ম সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গ্রুপটিকে দেওয়া বৈদেশিক বাণিজ্যের ঋণ সুবিধার বিপরীতে রূপালী ব্যাংকের কাছে জামানত ছিল নিতান্তই নগণ্য। করপোরেট গ্যারান্টি, পোস্ট ডেটেড চেক ছাড়া মাত্র ১০ কোটি টাকার বন্ধকী সম্পত্তির বিনিময়ে প্রতিষ্ঠানটি শত শত কোটি টাকার ঋণ সুবিধা ভোগ করে আসছিল বলে জানা গেছে। অর্থঋণ আদালতের অনুমতিতে ব্যাংকের সম্পত্তি নিলামে উঠলেও বন্ধকী সম্পত্তির ক্রেতা পাওয়া যায়নি। খেলাপি হওয়ার প্রথম পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি থেকে রূপালী ব্যাংক আদায় করেছে মাত্র চার কোটি ১০ লাখ টাকা।

এ প্রসঙ্গে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আতাউর রহমান প্রধান বলেন, টাকা আদায়ে সমঝোতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ব্যর্থ হয়ে গ্রুপটির বিরুদ্ধে মামলা করেছি। তারা মামলার বিপরীতে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন করে স্থগিতাদেশ এনেছে। এতে তারা সিআইবি রিপোর্টে ফ্রি হলেও ব্যাংকের কাছে খেলাপি রয়ে গেছে।

এদিকে দুর্দশাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানটি আবারও ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে চলেছে। এ প্রসঙ্গে নূরজাহান গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহির আহমেদ বলেন, আমরা মামলা করে স্থগিতাদেশ পেয়েছি। এর মধ্যে ব্যবসা গুছিয়ে নিতে চাই। দু’পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা চাই। তবে এ বিষয়ে এখনও বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সাড়া পাইনি।

উল্লেখ্য, ভোজ্য তেলের বাজারে এক সময়ের নিয়ন্ত্রক নূরজাহান গ্রুপ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সঠিকভাবে ব্যবহার করেনি। বাজারে আধিপত্য ধরে রাখতে ভোজ্য তেল আমদানিতে বেহিসেবি বিনিয়োগ করে। আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দরপতনের কারণে লোকসানে পড়ে গ্রুপটি। তাছাড়া ব্যবসার সঙ্গে ঋণের কোনো সামঞ্জস্য না থাকা এবং ব্যবসাবহির্ভূত কাজে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ায় ক্রমেই রুগ্ণ হয়ে পড়ে নূরহাজান গ্রুপ।

শেয়ারবার্তা / শহিদুল্ ইসলাম

অনুসন্ধানী রিপোর্ট এর সর্বশেষ খবর

উপরে