ঢাকা, সোমবার, ১৩ আগস্ট ২০১৮, ২৯ শ্রাবণ ১৪২৫

কিভাবে চিহ্নিত করবেন প্রতারক কোম্পানি?

২০১৮ মার্চ ২৮ ২২:৫৭:৩০
কিভাবে চিহ্নিত করবেন প্রতারক কোম্পানি?

আপনি যদি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে সফল হতে চান প্রথমেই আপনাকে ভাল মৌলভিত্তিক ও সম্ভাবনাময় কোম্পানি নির্বাচন করতে হবে। ভাবছেন এ আর নতুন কি? কেউ কেউ হয়তো এটাও ভাবছেন, আমাদের বাজারে ফান্ডামেন্টাল শেয়ারে বিনিয়োগ করে কোন লাভ নেই। কিন্তু আসলে কি তাই? দুর্বল মৌলভিত্তিক কোম্পানির মূল্য সাময়িক সময়ের জন্য বৃদ্ধি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর পতন অবশ্যম্ভাবী।

লক্ষ্য করে দেখুন, সাম্প্রতিক সময়ে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে আসা অনেক নতুন কোম্পানির শেয়ার প্রথম কিছুদিন উচ্চমূল্যে লেনদেন হলেও দীর্ঘমেয়াদে মূল্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়নি। অনেক শেয়ারের মূল্য কমতে কমতে ইস্যু মূল্যের কাছাকাছি বা নিচে এসে পড়েছে। ফলে অনেক বিনিয়োগকারী হচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত কিম্বা বঞ্চিত। একটু ভিন্নভাবে বলা যায়, অনেকক্ষেত্রে তারা হচ্ছেন প্রতারিত। আর এ প্রতারণার মূলে রয়েছে ঐ সকল কোম্পানির প্রভাবশালী ও দুষ্টু ডিরেক্টর বা স্পন্সরগণ। শেয়ারবাজারে আপনাকে টিকে থাকতে হলে এ সকল প্রতারক কোম্পানিকে চিহ্নিত করে এদের রাহুগ্রাস হতে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হবে।

এখন প্রশ্ন হল কিভাবে চিহ্নিত করবেন এ সকল প্রতারক কোম্পানি? প্রতারক কোম্পানি খুজে বের করা খুব কঠিন কাজ নয়। একটু চোখ-কান খোলা রেখে ও বিচার-বুদ্ধি প্রয়োগ করলে সহজেই চিহ্নিত করতে পারবেন প্রতারক কোম্পানিগুলি। নিম্নে এদের কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হল :

১। অসৎ উদ্দেশ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া : আমরা জানি, কোন কোম্পানি তার ব্যবসা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে মূলধন সংগ্রহের জন্য ব্যাংক বা অন্য কোন উৎস হতে ঋণ গ্রহণ করে অথবা পুঁজিবাজার হতে অর্থ উত্তোলন করে। পুঁজিবাজার হতে মূলধন সংগ্রহ করলে সুবিধা বেশি, কারন এতে ঋণের সুদ দিতে হয় না। বরং কর অবকাশসহ নানাবিধ সুবিধা পাওয়া যায়। অন্যদিকে সাধারন বিনিয়োগকারীগণ কোম্পানির মুনাফার অংশ পেয়ে লাভবান হতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক কোম্পানি পুজিবাজারে আসে তার রুগ্ন শিল্প বা ব্যবসাকে উচ্চ মূল্যে পাবলিক এর নিকট বিক্রয় করতে অথবা পাবলিক এর টাকা দিয়ে ব্যাংক ঋণের বোঝা মাথা থেকে নামিয়ে নিশ্চিন্ত হতে।

২। মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে আইপিও- তে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম আদায় করা : এ উদ্দেশ্যে কোম্পানির স্পন্সর/ডিরেক্টরগণ নানারূপ ছলচাতুরী বা কূটকৌশল অবলম্বন করে থাকে। তারা কোম্পানির আর্থিক বিবরণী তে আয় ও সম্পদ বিষয়ে মিথ্যা বা অতিরঞ্জিত তথ্য দিয়ে আইপিও-তে ইস্যু মূল্য বৃদ্ধি করে। আর আইপিও ইস্যুয়ার প্রতিষ্ঠানগুলোও অনৈতিকভাবে কোম্পানির উদ্দেশ্য হাসিলে সহযোগিতা করে। এভাবেই তালিকাভুক্ত হচ্ছে অনেক প্রতারক কোম্পানি।

৩। বিনা কারণে শুধু স্টক ডিভিডেন্ড বা বোনাস দেয়া : যদি কোম্পানির ব্যবসার পরিধি বিস্তার (Business Expansion) এর পরিকল্পনা থাকে তবে বিনিয়োগকারিদের স্টক ডিভিডেন্ড বা বোনাস শেয়ার প্রদান করে পেইড-আপ ক্যাপিটাল বাড়ানো যুক্তিযুক্ত। কিন্তু ভেবে দেখতে হবে এতে যেন ভবিষ্যতে শেয়ার প্রতি আয় বা ইপিএস এর ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু প্রতারক কোম্পানিগুলি ব্যবসার পরিধি বিস্তার ছাড়াই আয়ের সাথে সামঞ্জস্যহীনভাবে প্রতিবছর শুধু বোনাস ঘোষণা করে। প্রকৃতপক্ষে এরা বিনিয়োগকারীকে টাকাতে লভ্যাংশ দিতে চায় না ; এরা শুধু কাগজের লাভ দিতে চায়। এতে ভবিষ্যতে ইপিএস কমে যায় এবং শেয়ারের দাম কমতে থাকে। ফলে বিনিয়োগকারিগন ক্রমাগত প্রতারিত হতে থাকেন।

৪।ডিরেক্টর বা স্পন্সরগণ কতৃক শেয়ার বিক্রি করা : প্রতারক কোম্পানি উদ্যোক্তা বা পরিচালকদের অন্যতম উদ্দেশ্য থাকে তাদের হোল্ডিংকৃত শেয়ার উচ্চমূল্যে পাবলিকের নিকট বিক্রি করা। তারা কোম্পানির সমৃদ্ধির প্রচেষ্টায় না থেকে শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধির জন্য সদা তৎপর থাকেন। এ উদ্দেশ্যে তারা প্রায়ই বিভিন্নরকম মূল্য সংবেদনশীল তথ্য প্রচার করে ও নানারকম গুজব সৃষ্টি করে শেয়ারে দাম বৃদ্ধি করে হোল্ডিং শেয়ার বিক্রির মহোৎসবে মেতে উঠে। যখনই শেয়ারের মূল্য বাড়ে তখনই পরিচালক বা উদ্যোক্তাগণ শেয়ার বিক্রি করে থাকেন। এভাবে শেয়ার বিক্রি করতে করতে একসময় হোল্ডিং এর ন্যূনতম অবস্থানে পৌঁছায়।

৫। সম্প্রসারণের অজুহাতে রাইট শেয়ার অফার করা : আইপিও-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত টাকা নয়ছয়-এর পর কোন কোন কোম্পানি এক ধাপ এগিয়ে নতুন করে পাবলিকের পকেট হাতিয়ে নেয়ার জন্য সম্প্রসারণের অজুহাতে রাইট শেয়ার ইস্যু করে। রাইট এর টাকা উত্তোলনের পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসকল কোম্পানির শেয়ার প্রতি আয় তলানিতে ঠেকে।

৬। আয় সংক্রান্ত মিথ্যা বা গোঁজামিল তথ্য দেয়া : এ সকল কোম্পানির আর্থিক বিবরণীতে মিথ্যা বা অসংগতিপূর্ণ তথ্য থাকে। বছর-টু-বছর বা কোয়ার্টার-টু-কোয়ার্টার আয় ও ডিভিডেন্ড-এর কোন ধারাবাহিকতা থাকে না। তাদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ইচ্ছামত রিপোর্ট প্রকাশ করে।

৭। এমালগামেশনের নামে বাজে কোম্পানির শেয়ার হাতে ধরিয়ে দেয়া : প্রথমে সহযোগী খারাপ কোম্পানিকে আইপিও-এর মাধ্যমে বাজারে আনার চেষ্টা করা হয়। ব্যর্থ হলে প্রতারক কোম্পানি এমালগামেশন বা মার্জার নামক ফাদে ফেলে ঐ বাজে কোম্পানির শেয়ার বিক্রির ধান্দা করে।

৮। ইন্সাইডর ট্রেডিং বা স্পন্সর/ডিরেক্টরগণ কর্তৃক শেয়ার লেনদেন করা : প্রতারক পরিচালকবৃন্দ নামে-বেনামে তাদের কোম্পানির শেয়ারের লেনদেনে লিপ্ত থাকেন। আবার কোন কোন ধান্দাবাজ পরিচালকগণ সিন্ডিকেট বা গেমব্লারদের সাথে একসাথে কাজ করে শেয়ারের মূল্য বাড়িয়ে বেনামে থাকা শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। আবার ইচ্ছা করে খারাপ নিউজ দিয়ে শেয়ারের মূল্য কমিয়ে বেনামে শেয়ার কালেকশন করে। কালেকশন শেষে কোম্পানির ভাল নিউজ দিয়ে দাম বাড়িয়ে শুরু হয় শেয়ার বিক্রয়। এভাবেই চলতে থাকে চক্রাকার খেলা।

৯। ধারাবাহিকভাবে কোম্পানির শেয়ারের মূল্য পতন : দীর্ঘমেয়াদে এ সকল কোম্পানির শেয়ারের মূল্য ধরে রাখতে পারে না। যখন উদ্যোক্তা/পরিচালকদের শেয়ার বিক্রি শেষ হয় তখন কোম্পানির আসল চেহারা ফুটে উঠা শুরু হয়। দাম কমতে কমতে ফেসভেলুর নিচে বা কাছাকাছি চলে আসে। এভাবে একসময়কার অতি প্রিয় শেয়ারটি হয়ে উঠে শেয়ারবাজারের আগাছা।

১০। ডিরেক্টরগণ কর্তৃক সেচ্ছাচারিতা : এরা ইছামত পাবলিকের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। এরা সম্পূর্ণভাবে বিনিয়োগকারিদের স্বার্থ উপেক্ষা করে চলে। যাকে বলে পরের ধনে পোদ্দারি।

সুতরাং কোন কোম্পানিতে বিনিয়োগের পূর্বে ঐ কোম্পানি ও উদ্যোক্তা/পরিচালকদের সম্পর্কে একটু ভালভাবে খোঁজখবর নিন। কোম্পানির শেয়ারবাজারে আসার মূল উদ্দেশ্য কি তা কোম্পানির প্রসপেক্টাস পড়ে বুঝে নিন। তাছাড়া উদ্যোক্তা/পরিচালকদের পরিচিতি, যোগ্যতা, সুনাম ও অতীত ইতিহাস সম্পর্কে জানুন। একমাত্র সচেতনতাই পারে এ প্রতারক চক্রের হাত থেকে আপনার বহুমূল্যবান পুজিকে রক্ষা করতে।

লেখক:শফিকুল ইসলাম
শেয়ারবার্তা / মামুন

সাক্ষাৎকার এর সর্বশেষ খবর

উপরে