ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

ইউএনডিপির পর্যবেক্ষণ

১০ শতাংশ ব্যক্তির কাছে দেশের সবকিছু কুক্ষিগত

২০১৮ মার্চ ১৩ ১৮:৪৮:০৩
১০ শতাংশ ব্যক্তির কাছে দেশের সবকিছু কুক্ষিগত

দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ ধনী পরিবারের হাতে মোট আয়ের ৩৮ শতাংশ। আয় বণ্টন ব্যবস্থার এ কেন্দ্রীভবনের জন্য রেন্ট সিকিং (লুটপাট ও দুর্নীতি) প্রবণতাকে দায়ী করছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। সংস্থাটি বলছে, আয়ের এত বড় অংশ কীভাবে মাত্র ১০ শতাংশের হাতে কুক্ষিগত হলো, তা বুঝতে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে অবাধে ঋণ নিয়ে তা ফেরত না দেয়া, পুঁজিবাজার কারসাজি, কর ফাঁকি, সরকারি কেনাকাটা ও ব্যয়ে দুর্নীতি— সর্বোপরি ভূমি দখলের ঘটনাগুলোই যথেষ্ট।

এ প্রক্রিয়ায় গুটিকয় মানুষের হাতে আয় বণ্টন কেন্দ্রীভূত হওয়ার অর্থ হলো, জাতীয় আয়ে বাকিদের অংশ কমছে। ইউএনডিপি বলছে, আয়ের কেন্দ্রীভবন এত দ্রুত ঘটছে যে, সম্পদশালী পরিবারগুলো আরো বেশি ধনী হচ্ছে, অন্যদিকে আরো বেশি নাজুক হচ্ছে সবচেয়ে দরিদ্র ও ভঙ্গুর জনগোষ্ঠী।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোসহ (বিবিএস) সরকারি বিভিন্ন সংস্থার সর্বশেষ উপাত্তের ভিত্তিতে গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিস্থিতির হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইউএনডিপি। এতে আয় ও ভোগব্যয় বৈষম্য, সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস ও কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রতিবেদনের আয় ও ভোগব্যয় বৈষম্যের অংশটিতে এ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে সংস্থাটি।

কোনো দেশে আয়বৈষম্য কতটা, তা পরিমাপের নির্দেশক জিনি সহগ। শূন্য থেকে ১— এ পরিসীমার মধ্যে এটি হিসাব করা হয়। জিনি সহগের মান যত কম হয়, আয়বৈষম্য তত কম বলে ধরে নেয়া হয়। আর সহগের মান উচ্চ হলে তা আয় বা সম্পদ বণ্টনে অধিকতর অসমতা নির্দেশ করে। জিনি সহগের মান শূন্য হলে তা দ্বারা চরম সমতা (অর্থাৎ সবার আয় সমান) বোঝায়। সহগটির মান যদি বাড়তে বাড়তে দশমিক ৫ বা তার বেশি হয়, তার অর্থ হলো— দেশে আয়বৈষম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

বিবিএসের উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ইউএনডিপি বলছে, ২০১০ সালে দেশে জিনি সহগের মান ছিল দশমিক ৪৫৮। ২০১৬ সালে এসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৪৮৩-এ। একই সময়সীমায় গ্রামাঞ্চলে জিনি সহগের মান দশমিক ৪৩ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৪৫-এ। শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে এ মান ২০১০ সালে ছিল দশমিক ৪৫। ২০১৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে দশমিক ৫-এ।

আয়বৈষম্যের এ চিত্র থেকে চারটি পর্যবেক্ষণ দিয়েছে ইউএনডিপি। প্রথমত. দেশে আয়বৈষম্য ছয় বছরে অনেক প্রকট হয়েছে। দ্বিতীয়ত. এ সময়ে সবচেয়ে দরিদ্র ও নাজুক অংশটি আরো দরিদ্র হয়ে উঠেছে। তৃতীয়ত. সবচেয়ে ধনী অংশ দ্রুত আরো সম্পদশালী হয়ে ওঠায় তাদের মধ্যেই আয় আরো কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। চতুর্থত. দারিদ্র্যের মাত্রা গ্রামীণ দরিদ্রদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি।

উন্নয়নের একটা পর্যায়ে সমাজে আয়বৈষম্য বাড়তে পারে বলে জানান পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম। তবে এর লাগাম টানতে দারিদ্র্যপ্রবণ অঞ্চলগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ড. শামসুল আলম বলেন, ব্যাপক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সত্ত্বেও কেন আয়বৈষম্য বাড়ছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। দারিদ্র্যপ্রবণ অঞ্চলগুলোয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদারের পাশাপাশি শিক্ষা খাতেও গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। আগামী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেয়া হবে।

দেশের দরিদ্রতম জনগোষ্ঠী আরো নাজুক হচ্ছে মূলত জাতীয় আয়ে তাদের অংশীদারিত্ব কমার কারণে। বিবিএসের সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপের উপাত্ত ব্যবহার করে ইউএনডিপি তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, ২০১০ সালেও জাতীয় আয়ে সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ খানার অংশীদারিত্ব ছিল দশমিক ৭৮ শতাংশ। ২০১৬ সালে তা আরো কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র দশমিক ২৩ শতাংশে। এর বিপরীতে সবচেয়ে সম্পদশালী ৫ শতাংশ খানার আয় অংশীদারিত্ব ২৪ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৭ দশমিক ৯ শতাংশে। আয়ের দিক থেকে খানাগুলো ১০ ভাগ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে শুধু শীর্ষ ১০ শতাংশের আয়ের অংশীদারিত্ব ছয় বছরে ৩৫ দশমিক ৮ থেকে বেড়ে ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. কেএএস মুরশিদ বলেন, কোনো অর্থনীতি যখন দ্রুতগতিতে এগোয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা আয়বৈষম্য তৈরি হতে পারে। তবে সেটি কতটুকু সহনীয় তা দেখার বিষয়। ব্যাপক অনিয়ম ও ব্যাংকিং খাতে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের মতো যেসব ঘটনা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন, সেগুলো অর্থনীতিতে ভালো কোনো সংকেত দিচ্ছে না। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী ছাড়াও বৈষম্য দূরীকরণের আরো কী ধরনের কর্মসূচি নেয়া যেতে পারে, সেটি ভেবে দেখতে হবে। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন ও মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে অনিয়ম-দুর্নীতির পাশাপাশি বৈষম্যও কমানো যাবে না।

আয়বৈষম্যের চিত্রের পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে ভোগ ব্যয়েও। ভোগ ব্যয়ের দিক থেকে খানাগুলো ১০ ভাগে ভাগ করে দেখা গেছে, ২০১৬ সালে মোট জাতীয় ভোগ ব্যয়ে সর্বনিম্ন ১০ শতাংশের অংশীদারিত্ব দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৭ শতাংশে; ২০১০ সালে যা ছিল ৩ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬ সালে শীর্ষ ১০ শতাংশের ভোগ ব্যয়ে অংশীদারিত্ব দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৮ শতাংশে।

ইউএনডিপির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভোগ ব্যয়ের দিক থেকে এ সময় শহরাঞ্চলে বৈষম্যের মাত্রা সামান্য বাড়লেও গ্রামাঞ্চলে বেড়েছে অনেকখানি। ভোগ ব্যয় সূচকে দেশের গ্রামাঞ্চলে জিনি সহগের মান ২০১০ সালের দশমিক ৩ থেকে এক লাফে বেড়ে হয়েছে দশমিক ৯। আর শহরাঞ্চলে তা দশমিক ৩৩ থেকে বেড়ে দশমিক ৩৪-এ দাঁড়িয়েছে।

ইউএনডিপির ন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাডভাইজর শামসুর রহমান বলেন, সরকারের তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ইউএনডিপি। প্রতিবেদনে যেসব বিষয় উঠে এসেছে, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে।

ইউএনডিপি বলছে, ক্রমবর্ধবান এ বৈষম্য থেকে উত্তরণে মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর কথা বলেছে তারা। এজন্য রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সুপারিশে ইউএনডিপি বলেছে, একটি প্রগতিশীল ও বিস্তৃত প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। তবে বাংলাদেশের পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা বিবেচনায় বলা যায়, এক্ষেত্রে ভ্যাট হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ সমাধান। এছাড়া নীতিমালা ও আইনের প্রয়োগ এবং মানবসম্পদ ও দরিদ্রদের আয়বর্ধনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সম্পদ ও আয়ের বহুমুখী বণ্টন এক্ষেত্রে অনেক সম্ভাবনাময় সমাধান হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া আয় বণ্টন পরিস্থিতির উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকারের সম্ভাব্য আরেকটি পদক্ষেপ হতে পারে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে মানবসম্পদ উন্নয়ন। এতে দরিদ্রদের জন্য উন্নততর ও বেশি আয়ের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যাবে। একটি শিক্ষিত ও সামর্থ্যবান শ্রমশক্তি একদিক থেকে যেমন আয় বণ্টন পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে পারবে, তেমনি দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।

কার্যকর আর্থিক নীতিমালা প্রয়োগের পাশাপাশি সুশাসন নিশ্চিতের মাধ্যমেও আয়বৈষম্য কমানো সম্ভব বলে মনে করছে ইউএনডিপি। সংস্থাটির মতে, এজন্য আইনের শাসন ও যথাযথ নীতিমালার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিকশিত হতে ও কাজ করতে দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, রাজউক, পৌরসভা ও ভূমি প্রশাসনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বদলে নিয়মনীতি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলেই দেশে আয় বণ্টন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো যাবে।


শেয়ারবার্তা / জুয়েল











সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে