ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ জুন ২০১৮, ৮ আষাঢ় ১৪২৫

২০২৪ সাল পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশই থাকবে বাংলাদেশ

২০১৮ মার্চ ০৯ ০৭:০১:৪৩
২০২৪ সাল পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশই থাকবে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে আর তিন দিন পর। কিন্তু চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশ এ তালিকা থেকে বের হবে ২০২৪ সালে। সে পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবেই পরিগণিত হবে। আর এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যেসব সুবিধা পায়, সেগুলো বহাল থাকবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। সে হিসেবে এলডিসি থেকে উত্তরণ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য প্রায় ১০ বছর সময় পাবে বাংলাদেশ।

এলডিসি থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে আজ নিউইয়র্কে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সাব-গ্রুপ সভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে এলডিসি দেশগুলোর সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করা হবে। ১২ থেকে ১৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে সিডিপির ২০তম অধিবেশন বসবে। ওই অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে এলডিসিগুলোর গত তিন বছরে আর্থসামাজিক খাতের অগ্রগতি পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে এমন ঘোষণা আসতে পারে। সভায় বাংলাদেশের পক্ষে অংশ নেবেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন।

বাংলাদেশের জন্য এলডিসি থেকে বের হওয়ার বিষয়ে এটি প্রথম সুপারিশ। মূলত যে তিনটি সূচকের ভিত্তিতে এ সুপারিশ করা হবে, সেগুলো টেকসই হবে কি না-তা প্রত্যক্ষ করার জন্য আরও তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে। এ তিন বছর যদি বাংলাদেশের অবস্থান টিকিয়ে রাখা যায়, তাহলে ২০২১ সালে ইকোসকে দ্বিতীয় সুপারিশ করবে সিডিপি। ওই সুপারিশের পর আরও তিন বছর অপেক্ষা করা হবে। সর্বশেষ ২০২৪ সালে ইকোসকে চূড়ান্ত সুপারিশ করা হবে। পরে বিষয়টি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করা হবে। সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করবে যে, বাংলাদেশ এলডিসি তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উন্নীত হলো। সে পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায়ই থাকবে।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, চলতি মাসে বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে আসবে বলে যে কথা শোনা যাচ্ছে, তা বিভ্রান্তিকর। মূলত এটি প্রথম সুপারিশ। চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশ এ তালিকা থেকে বের হবে ২০২৪ সালে।

এদিকে এলডিসি থেকে উত্তরণের বিষয়টি উদ্যাপনের উদ্যোগ নিয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। গত বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত ‘অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ইআরডির এ প্রস্তাবে নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।

সিডিপির প্রথম সুপারিশকে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের উন্নয়নে একটি বড় অর্জন এবং বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা ও ভিশন ২০২১-এর সফল রূপায়ণ বলে মনে করছে ইআরডি। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্পোন্নত দেশের স্ট্যাটাস থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যাপনে আগামী ২২ ও ২৩ মার্চ দু’দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে যাচ্ছে ইআরডি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এলডিসিবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সদস্য সচিব মনোয়ার আহমেদ বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এ পর্যন্ত এটি বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় অর্জন। সে জন্যই উদ্যাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইআরডির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, এলডিসি থেকে উত্তরণ উদ্যাপন উপলক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে সেমিনার ও কনফারেন্স খাতে বিশেষ বরাদ্দ চাওয়া হবে। আর এ অনুমোদিত বাজেট থেকেই অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এক বা একাধিক প্রতিষ্ঠান ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা ক্রয় করবে ইআরডি।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য (জ্যেষ্ঠ সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণের বিষয়টি মূল্যায়নে সিডিপি আমাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়েছে। প্রায় সব তথ্যের সঙ্গেই তারা একমত। কাজেই আমরা এবার তিনটি সূচকেই নির্ধারিত মান অর্জন করব।’

উল্লেখ্য, সিডিপি তিনটি সূচকের ভিত্তিতে এটি সুপারিশ করে। এগুলো হলো-মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা। এলডিসি থেকে উত্তরণের সুপারিশের জন্য অ্যাটলাস পদ্ধতিতে পরপর তিন বছর মাথাপিছু আয় কমপক্ষে এক হাজার ২৩০ ডলার হতে হবে। বর্তমানে এ পদ্ধতিতে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এক হাজার ২৭২ ডলারের ওপরে। আর ইকোসক নির্ধারিত সূচকে মানবসম্পদে কোনো দেশের পয়েন্ট ৬৬-এর বেশি হতে হবে; সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের আছে ৭২ দশমিক আট পয়েন্ট। আর অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে কোনো দেশের পয়েন্ট ৩২-এর নিচে থাকতে হবে। বাংলাদেশের এ পয়েন্ট এখন ২৫।

তবে এ বছর প্রথম সুপারিশ পেলেও এলডিসি-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি গ্রহণে প্রায় ১০ বছর সময় পাবে বাংলাদেশ। কারণ ২০২৪ সালে চূড়ান্তভাবে এলডিসি থেকে উত্তরণ হলেও এলডিসি দেশগুলোর জন্য বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার কাঠামোর মধ্যে প্রদত্ত বাণিজ্য সুবিধা বহাল থাকবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত। তাছাড়া এলডিসি থেকে বের হয়ে গেলেও বাণিজ্য সুবিধা বহাল রাখা সম্ভব বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করতে হবে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশকিছু দেশ এলডিসির বাইরে থাকা উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা দেয়। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশেরও এমন সুযোগ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে তা পেতে হলে বাংলাদেশকে অনেক দক্ষতার পরিচয় দিতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এ বিষয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এলডিসির তালিকায় থাকলে বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যাবে-এটা যেমন সত্য, ঠিক তেমনি এ তালিকা থেকে বের হয়ে গেলে যে তা একদম পাওয়া যাবে না, তেমনটিও নয়। এলডিসিভুক্ত দেশ হয়েও বাংলাদেশ অনেক দেশে জিএসপির মতো সুবিধা পাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়িয়ে পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে হবে।

শেয়ারবার্তা / শহিদৃল ইসলাম

সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে