ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৮, ৩০ আশ্বিন ১৪২৫

চীন-ভারত যুদ্ধের অবসান: স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে পুঁজিবাজার

২০১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯ ০৭:৫৭:০৩
চীন-ভারত যুদ্ধের অবসান: স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে পুঁজিবাজার

দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) কৌশলগত বিনিয়োগকারী বা স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হতে চায় চীনের পুঁজিবাজার সংস্থা শেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ভারতীয় ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, নাসডাক ও ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশ মিলে গঠিত কনসোর্টিয়াম। তবে কার কাছে শেয়ার বিক্রি করা হবে তা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)’র মধ্যে। সর্বোচ্চ দরের ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি নিয়ে ওই দুই সংস্থার মধ্যে মতবিরোধ, যা নিয়ে পুঁজিবাজারে একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, চীনের পুঁজিবাজার সংস্থা শেনজেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ শেয়ারপ্রতি দাম অফার করেছে ২২ টাকা। যা অভিহিত মূল্যের বিপরীতে সর্বোচ্চ দাম। আর ভারতীয় ন্যাশনাল এক্সচেঞ্জের নেতৃত্বে কনসোর্টিয়ারম অফার করেছে ১৫ টাকা। ডিএসই পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নেয় চীনের দুই সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত কনসোর্টিয়ামের কাছেই উল্লিখিত ২৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করা হবে।

কিন্তু ডিএসই’র সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। ফলে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে যায় ডিএসই। আর দুই সংস্থার রশি টানাটানির নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশের পুঁজিবাজারে। আতঙ্ক ছড়াতে থাকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। শুরু হয়ে যায় পুঁজিবাজারে নতুন করে রক্তক্ষরণ।

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, আজ সেই চীন-ভারত যুদ্ধের অবসান হচ্ছে। ডিএসই’র পরিচালনা পর্ষদ আজ চীন কনসোর্টিয়ামের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুমোদনের জন্য নিয়ন্ত্রক কাছে প্রেরণ করবে। ফলেেআজ কিংবা কাল থেকেই স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসবে দেশের পুঁজিবাজার-এমনটাই আশাবাদ ব্যক্ত করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মামলার রায়কে কেন্দ্র করে বছরের শুরু থেকেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। এই দুই গুজবে গত ৪ ফেব্রুয়ারি ১৩৩ পয়েন্ট কমে ডিএসইর প্রধান মূলসূচক। পরে ওই ধকল কাটিয়ে আবারও ঘুরে দাঁড়ায় পুঁজিবাজার। ডিএসইর কৌশলগত বিনিয়োগকারী ইস্যুতে আশার আলো দেখেন বিনিয়োগকারীরা। গত ৬ ফেব্রুয়ারি কৌশলগত বিনিয়োগকারীর দর খুলে ডিএসই পর্ষদ।

সূত্র মতে, ডিএসইর পার্টনার হওয়ার জন্য চীনের সাংহাই ও শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ নিয়ে গঠিত কনসোর্টিয়াম এবং ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ, নাসডাক এবং ফ্রন্টিয়ার বাংলাদেশ মিলে গঠিত কনসোর্টিয়ামের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে ১০ ফেব্রুয়ারি প্রথমটিকেই বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ডিএসই। যার ইতিবাঁচক প্রভাব পড়ে পুঁজিবাজারে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রথম কার্যদিবসেই ১১৮ পয়েন্ট বাড়ে ডিএসইর প্রধান সূচক।

একই দিন ডিএসইর কৌশলগত ইস্যুকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে তলব করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। তারা তাদের নেওয়া সিদ্ধান্তের উপর অটল থাকার কথা জানায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে। এরপরই শুরু হয় বিএসইসি ও ডিএসইর টানাপোড়েন। এর প্রভাবে বৃহস্পতিবার সূচক কমে প্রায় ৫২ পয়েন্ট। গতকাল সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস ডিএসইর প্রধান সূচক পড়ে যায় আরও ১০০ পয়েন্ট। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে অজানা আতঙ্ক ।

এদিকে, এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে গত (১৬ ফেব্রুয়ারি) শুক্রবার বিএসইসি’র বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি প্রেরণ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটি দাবী করে ডিএসইর কৌশলগত বিনিয়োগকারী ইস্যুতে অনৈতিক হস্তক্ষেপ করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। একইসঙ্গে এ ঘটনায় বিএসইসি নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করে এর তীব্র নিন্দা জানায় গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।

বিবৃতিতে দাবী করা হয়, দর প্রস্তাব মূল্যায়নে প্রায় অর্ধেক পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের তদবির ও চাপ প্রয়োগ যেমন নজিরবিহীন ও আইনবিরুদ্ধ, বিএসইসি কর্তৃক তাতে প্রভাবিত হয়ে বাছাই প্রক্রিয়াকে কলুষিত করে অযোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে ইন্ধন যোগানো তেমনই বেআইনি ও অগ্রহণযোগ্য।

টিআইবির অভিযোগের পর শনিবার বন্ধের দিন জরুরি সভায় বসে বিএসইসির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। টিআইবির করা মন্তব্যের কড়া জবাব দেয় বিএসইসি। ডিএসই স্ট্রাটেজিক পার্টনার নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনোরকম হস্তক্ষেপের অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠানটি। এ বিষয়ে শুক্রবার টিআইবি যে বিবৃতি দিয়েছে, সেটিকে দুঃখজনক বলে অভিহিত করে বিএসইসি।

এ বিষয়ে পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনাইটেড ইউনিভার্সিটির স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুসা বলেন, ৯৯ পয়েন্ট পড়ার মত এমন কোনো কারণ নেই। তবে এই মহুর্তে ডিএসইর কৌশলগত বিনিয়োগারী ইস্যু ছাড়া তেমন কিছু নেই। তিনি বলেন, এই ইস্যুতে নতুন করে বিনিয়োগকারীর মধ্যে আস্থার চির ধরেছে। যার নেতিবাঁচক প্রভাব পড়ছে বাজারে।

একই কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অনারারী অধ্যাপক আবু আহমদ। তিনি বলেন, এই মহুর্তে দেশের অর্থনীতির সব সূচকই ইতিবাঁচক। পুঁজিবাজার নেতিবাঁচক হওয়ার তেমন কোনো কারণ নেই। তবে কৌশলগত বিনিয়োগকারী ইস্যুর প্রভাব পুঁজিবাজারে পড়ছে বলে মনে হয়। মূলত চীনের পরিবর্তে কম দামে ভারতীয় কোম্পানিকে শেয়ার দেয়ার খবরে পুঁজিবাজারের এ অস্থিরতা বলে মনে বলে তিনি মনে করছেন।

এ বিষয়ে ডিএসই’র বর্তমান পরিচালক ও সাবেক সভাপতি মো. রকিবুর রহমান বলেন, ডিমিউচুয়ালাইজেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী যারা শর্ত পরিপূর্ণ করছে তাদেরকেই দিতে হবে। চীন আমাদের দরপত্রের শর্ত পরিপালন করেছে, আমরা তাদের কাছে শেয়ার বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এটাই শেষ কথা। তিনি বলেন, চীন ও ভারতের প্রস্তাব চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখছি। ভারত খাপছাড়া প্রস্তাব করেছে। আর চীন জেনুইন প্রস্তাব দিয়েছে। ফলে একটির সঙ্গে আরেকটির তুলনা হয় না।

জানা যায়, আজ ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সভায় বসছে। এ সভায় আগের পর্ষদ সভায় নেওয়া সিদ্ধান্ত চুড়ান্ত করে বিএসইসিতে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে বলে কয়েকজন পরিচালক জানান। তাঁরা দৃঢ়তার সাথে বলেন, “পুঁজিবাজারের ক্রান্তিলগ্নে আমরা কোন অনিয়মের পথে হাঁটবো না।”

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিএসই’র কৌশলগত বিনিয়োগকারী প্রশ্নে ডিএসই’র শক্ত অবস্থান প্রশংসাযোগ্য। তাঁরা মনে করেন, আজ বা কালকের মধ্যেই বাজার আবারও ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরে আসবে। বিনিয়োগকারীদের অধৈর্য্য না হওয়ার আহবান জানান তাঁরা।

শেয়ারবার্তা / শহিদুল ইসলাম

সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে