ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৪ আশ্বিন ১৪২৫

উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ারের মালিকানার তারতম্য প্রসঙ্গে

২০১৮ ফেব্রুয়ারি ১৭ ১৪:১৮:১৩
উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ারের মালিকানার তারতম্য প্রসঙ্গে

বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় জমাকৃত অর্থের ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশের মালিক সাধারণ জনমানুষের অন্তর্ভুক্ত আমানতকারীরা হলেও ব্যাংক পরিচালনায় তাদের কোনো ভূমিকা নেই। সামগ্রিক আমানতের ২ দশমিক ৫ শতাংশের মালিক হয়ে উদ্যোক্তা-পরিচালকরা ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সব সিদ্ধান্ত তাদের স্বার্থের অনুকূলে গ্রহণ করছেন।

এমন অনেক বিশিষ্ট উদ্যোক্তা-পরিচালক রয়েছেন, যাদের দেশের অভ্যন্তরে সামগ্রিক সম্পদের মূল্যমান ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণের চেয়ে কম। এসব উদ্যোক্তা-পরিচালক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে পরিস্থিতির প্রতিকূলতাকে বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংক থেকে ঋণের মাধ্যমে গৃহীত অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করে সেখানে বিকল্প আবাস গড়ে তুলেছেন। এ ধরনের বিকল্প আবাস গড়ার ক্ষেত্রে তারা প্রবাসে কর্মরত শ্রমিকদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা কালোবাজার থেকে ক্রয় করে বিদেশে পাচার করেছেন। এ ধরনের উদ্যোক্তা-পরিচালকদের অধিকাংশের ঋণ সময়মতো পরিশোধ না করার কারণে খেলাপি হওয়ায় পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন কলাকৌশলে সুদ মওকুফের সুযোগ সৃষ্টি করে ঋণগুলো পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা করে চলেছেন। এরা রাজনৈতিকভাবে আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় এদের ঋণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের নিয়ন্ত্রণ শিথিল ও অকার্যকর।

গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি নামক যে সংস্থাটি এক দেশ থেকে অন্য দেশে বিশেষত স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নত দেশে অর্থ পাচার বিষয়ে কাজ করে, সে সংস্থাটির তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে প্রায় ৬ লাখ হাজার কোটি টাকা বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে পাচার হয়ে গেছে। এ অর্থ পাচারের সঙ্গে যারা জড়িত, এদের এক বড় অংশ হলো বিভিন্ন ব্যাংকের উদ্যোক্তা-পরিচালক। এসব উদ্যোক্তা-পরিচালকের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে গৃহীত ঋণের বিপরীতে দেশে যে সম্পদ রয়েছে, এ বিষয়ে কার্যকর তদন্ত করা হলে ঋণের অর্থ তারা কীভাবে পাচার করছেন, এর সন্ধান মিলবে। তারা ক্ষমতাসীনদের ছত্রচ্ছায়ায় প্রভাবশালী বিধায় দুর্নীতি নির্মূলের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তাদের বিষয়ে তদন্তে কদাচিৎ আগ্রহী হতে দেখা যায়।

ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধান অনুযায়ী, একই সময়ে একই পরিবারের দুজনের অধিক সদস্য ব্যাংকের পরিচালক পদে বহাল থাকতে পারেন না। পরিচালক পদে নিয়োগ-পরবর্তী পদের মেয়াদকাল তিন বছর। এভাবে একজন পরিচালক তিন বছর ব্যাপ্তিকালে পরপর দুই মেয়াদের জন্য পরিচালক পদে বহাল থাকতে পারেন। সম্প্রতি ব্যাংক কোম্পানি আইনে সংশোধনী আনয়নপূর্বক একই সময়ে এক পরিবার থেকে একই ব্যাংকে সর্বোচ্চ চারজন সদস্যকে পরিচালক পদে নিয়োগের বিধান করা হয়েছে এবং পাশাপাশি একজন পরিচালকের দুই মেয়াদের পরিবর্তে পরপর তিন মেয়াদের জন্য পরিচালক পদে বহাল থাকার বিধান করা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইনে এ সংশোধনীটি আনার বিষয়ে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকরা যে সরকারের ওপর প্রভাব খাটিয়ে তাদের স্বীয় অশুভ স্বার্থ হাসিলের জন্য কাজটি করেছেন, তা ব্যাংকিং খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনুধাবন করতে সক্ষম হলেও এসব প্রভাবশালী পরিচালকের ক্ষমতার কাছে তারা অসহায়।

একজন উদ্যোক্তা-পরিচালক বা তার মনোনীত প্রতিনিধিকে পরিচালক পদে বহাল থাকার জন্য ব্যাংকের মূলধনের ২ শতাংশ শেয়ারের মালিক হতে হয়। কিন্তু ব্যাংকের একজন সাধারণ শেয়ারহোল্ডার পরিচালক হতে চাইলে তাকে মূলধনের ৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক হতে হয়। একটি ব্যাংকের পরিচালক হওয়ার ব্যাপারে উদ্যোক্তা-পরিচালক ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে শেয়ারের মালিকানা বিষয়ে যে তারতম্য, তা দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানের মৌলিক অধিকারবিষয়ক বিধান— আইনের দৃষ্টিতে সমতা, এর পরিপন্থী। এ বিধানটিতে স্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছে, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। আইন প্রণয়নের সময় আইনপ্রণেতাদের যে দুটি বিষয়ের ওপর দৃষ্টি দেয়া জরুরি তা হলো, আইনটি জনস্বার্থে প্রণীত হচ্ছে কিনা এবং এটি সংবিধানের মৌলিক অধিকারসংক্রান্ত বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিনা। ব্যাংক কোম্পানি আইনের বিধান অনুযায়ী, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের পরিচালক পদে বহাল এবং সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের পরিচালক পদে নিয়োগলাভের ক্ষেত্রে শেয়ার হোল্ডিংয়ের যে তারতম্য, তা কোনোভাবেই আইন প্রণয়নের জন্য অপরিহার্য উল্লিখিত যে দুটি বিষয়, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

প্রতিটি বাণিজ্যিক ও বেসরকারি ব্যাংকের কার্যক্রম যেন সুষ্ঠু, আইনানুগ, সুচারুরূপে ও গ্রাহকের স্বার্থে পরিচালিত হয়, সেটি নিশ্চিত করা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পর্ষদের যেমন দায়িত্ব, অনুরূপ ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগেরও সমরূপ দায়িত্ব। এ দায়িত্বটি যথার্থভাবে পালন করতে হলে একটি ব্যাংকে পর্যাপ্ত জ্ঞানসম্পন্ন একাধিক স্বতন্ত্র পরিচালকের নিয়োগ আবশ্যক। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাণিজ্যিক আইন বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞানসম্পন্ন সৎ, দক্ষ, যোগ্য এমন সব ব্যক্তিকে স্বতন্ত্র পরিচালক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। এসব স্বতন্ত্র পরিচালক পদে বহাল থাকাকালীন নিঃস্বার্থভাবে ব্যাংক, আমানতকারী ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থকে সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক মতাদর্শ মুখ্য হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে স্বতন্ত্র পরিচালকদের বাণিজ্যিক আইন বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞান এবং সততা, দক্ষতা ও যোগ্যতা এ বিষয়গুলো গৌণ। একটি ব্যাংকে কতজন স্বতন্ত্র পরিচালক থাকবেন, এ বিষয়ে নির্ধারিত কোনো বিধান না থাকায় যথাযথ যোগ্যতা ও জ্ঞানসম্পন্ন যত অধিকসংখ্যক স্বতন্ত্র পরিচালকের নিয়োগ ঘটবে, তা সে হারে ব্যাংক ও আমানতকারীদের স্বার্থের অনুকূলে হবে। কিন্তু স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে সবসময়ই ব্যাংক ও আমানতকারীদের স্বার্থ উপেক্ষিত হয়ে আসছে।

একটি ব্যাংকের উদ্যোক্তা-পরিচালকের নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণে বিধিনিষেধ থাকলেও অধিকাংশ উদ্যোক্তা-পরিচালক বেনামে অথবা একে অন্যের ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে তাদের অভীষ্ট আর্থিক লক্ষ্য হাসিল করে চলেছেন। বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কর্মকর্তা হিসেবে যারা কর্মরত রয়েছেন, এদের সবার নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হলো, উদ্যোক্তা-পরিচালক সমন্বয়ে গঠিত ব্যবস্থাপনা বোর্ড। সুতরাং ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সিদ্ধান্ত ব্যাংকের স্বার্থের প্রতিকূলে হলেও চাকরি রক্ষার্থে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ব্যাংকে কর্মরত কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ তাদের চাকরির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়। আর এ কারণেই উদ্যোক্তা-পরিচালকদের বেপরোয়া হওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকের অভ্যন্তরে কর্মকর্তা পর্যায়ে যারা রয়েছেন, তাদের বাধা দেয়ার ক্ষমতা দুর্বল।

উদ্যোক্তা-পরিচালকদের অন্যায় লোভের কারণে অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংক কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ। আর এ ব্যর্থতায় ব্যাংকের শেয়ার ক্রয় করে যেসব বিনিয়োগকারী মনে মনে লাভের হিসাব কষছিলেন, তারা ব্যাংক কর্তৃক লভ্যাংশ ঘোষণা-পরবর্তী আশাহত ও ব্যথিত। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সম্মিলিতভাবে ব্যাংকের মূলধন ও সামগ্রিক আমানতের সিংহভাগের মালিক হওয়া সত্ত্বেও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের ভূমিকা শূন্য। আর এভাবে মূলধন ও আমানতের মোটা অংকের মালিকদের ব্যাংক পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রে ভূমিকা না থাকলে, সে ব্যাংক কখনো প্রকৃত অর্থে ঋণ ও বিনিয়োগের সমন্বয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠান না হয়ে স্বার্থান্বেষী উদ্যোক্তা-পরিচালকদের অনেকটা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের ন্যায় অযৌক্তিকভাবে তাদের সুযোগ-সুবিধা সংরক্ষণে ব্যতিব্যস্ত থাকবে।

লেখক: সাবেক জজ; সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

বাজার বিশ্লেষণ এর সর্বশেষ খবর

উপরে