ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৫ আশ্বিন ১৪২৫

শেয়ারবাজারে সুন্দরী প্রতিযোগিতা!

২০১৮ ফেব্রুয়ারি ১৫ ০০:০৪:৩৩
শেয়ারবাজারে সুন্দরী প্রতিযোগিতা!

গল্পে আছে, এক লোক কোনো এক গ্রামে এসে ১০ টাকা দরে বানর কিনতে চাইলে গ্রামবাসী বন থেকে যত বানর পারল ধরে নিয়ে এল। এতে বানরের সংখ্যা কমে যেতে লাগল। অর্থনীতির সূত্র বলে, চাহিদা বেশি ও জোগান কম হলে জিনিসের দাম বাড়ে। ব্যতিক্রম এখানেও নেই। আর তাই এবার ব্যক্তিটি প্রতিটি বানরের দাম দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল— ২০ টাকা। প্রত্যাশিত মুনাফার মায়াবন্ধনে পড়ে গ্রামবাসী হাটে-মাঠের কাজ ছেড়ে দিয়ে শুধু বানর ধরার জন্য এদিক-ওদিক ছোটাছুটি শুরু করে দিল। সরবরাহ আরো কমে যেতে থাকলে দাম উঠে গেল বানরপ্রতি ২৫ টাকায়। এরই মধ্যে বনের বানর শেষ প্রায়। সুতরাং ধরবে কোথা থেকে? লোকটি তখন প্রতিটি বানরের দাম ৫০ টাকা তুলে তার সহকারীর কাছে বানর সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়ে জরুরি কাজে শহরে চলে গেল। লোকটির সহকারী গ্রামবাসীকে বলল, আমি বড় খাঁচায় রাখা সব বানর প্রতিটি ৩৫ টাকা দরে তোমাদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছি; আমার মালিক শহর থেকে ফিরে এলে প্রতিটি বানর তোমরা ৫০ টাকায় তার কাছে বিক্রি করে দিতে পারো। এ কথা শুনে গ্রামবাসী তাদের সব সঞ্চয় দিয়ে বানরগুলো কিনে নিল। তারপর তারা কোথাও ওই লোকটি বা তার সহকারীর সন্ধান পেল না; চারদিকে দেখল শুধু বানর আর বানর। শেয়ারবাজারে সুস্বাগতম।

ষাঁড় ও ভল্লুকের ভুবন

বেশ কিছুকাল আগের কথা। পড়াশোনা শেষে শ্রান্তি বিনোদনের সময় টেলিভিশনে প্রচারিত কোনো একটা নাটকে চোখ পড়ে। খুব সম্ভবত নাটকটির নাম ছিল ‘এত দিন কোথায় ছিলেন’। সেখানে বাড়ির কাজের ছেলেটি পাগলের মতো বলেই চলেছে, ‘টেকা দ্যান দুবাই যামু, টেকা দেন দুবাই যামু।’ অনুমান করতে কষ্ট হলো না যে, চারপাশে বিদেশে বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার হিড়িক দেখে ছেলেটির এই পাগলামো অবস্থা; হয়তো সে জানেও না দুবাই জায়গাটি কোথায়, দুবাই দেখতে কেমন কিংবা ওখানে গিয়ে মানুষ কী কাজ করে। এ যেন অনেকটা দাঙ্গাকারী জনতার সাময়িক উন্মত্ততা, যাকে বলে মব ফ্রেঞ্জি।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের অবস্থা তথৈবচ। বাসার চাকরবাকরকে বলতে শোনা যায়, ‘খালু কিছু টেহা দ্যান, শেয়ার কিনুম, শেয়ারে থুইলেই নাকি পয়সা আহে।’ বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, বুঝে হোক আর না বুঝে হোক, প্রায় প্রতিটি ঘরে শেয়ারবাজারে অর্থ লগ্নি করার ‘লালসা’ বেশ তীব্র। ভাবটা এমন যে, ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি।’ প্রসঙ্গত বলা দরকার, শিল্প-কারখানার জন্য পুঁজি সংগ্রহের অন্যতম উৎস হচ্ছে শেয়ারবাজার। একই কাজ ব্যাংক থেকেও করা যায়, কিন্তু ব্যাংকের ঋণ সীমাহীন নয় বলে যত বিপত্তি। তাছাড়া ব্যয়সাশ্রয়ী উপায়ে এবং নমনীয় সুদে ঋণ পাওয়াটা অনেক সময় কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায় এবং সেক্ষেত্রে জনগণকে অংশীদার করে শেয়ারবাজার থেকে বিনিয়োগের অর্থ তুলে নেয়ার চেষ্টা চালানো ছাড়া বিকল্প থাকে না। পৃথিবীর বহু দেশে শেয়ারবাজার পুঁজি সংগ্রহের অন্যতম উৎসস্থল। বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের ওপর দিয়ে এত প্রবল ঝড়ঝাপটা বয়ে যাওয়া সত্ত্বেও গেল কয়েক বছর শেয়ারবাজার থেকে প্রায় ২০-২৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হয়। মজা করে বলা হয়, পৃথিবীর সর্বত্রই খুব দ্রুত ধনী কিংবা গরিব হওয়ার রাস্তার নাম শেয়ারবাজার। তবে মুশকিলটা হচ্ছে, কেউ বুঝতে চায় না যে শেয়ারবাজার অনেকটা ‘সুনামির’ মতো মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে খুব ঠাণ্ডা আবহ সৃষ্টি করে বিদায় নেয়। শেয়ারের দাম খুব দ্রুত উপরে ওঠে, তারপর খুব দ্রুতই ধপাৎ এবং ততক্ষণে সব শেষ।

দুঃখ ও দীক্ষা

শেয়ারবাজারে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ধসের কারণে প্রায় ৩০ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানা যায়। ক্ষোভে-দুঃখে নীতিনির্ধারকদের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে। ব্যাপক ভাংচুর হয়েছে, এমনকি দু-একজন ক্ষতির ভার সইতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। শেয়ারবাজারে লগ্নিকারী সব খুইয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন দক্ষিণ কোরিয়া, ভারতসহ অন্যান্য দেশেও। এ সবই সত্যি এবং দুঃখজনক ঘটনা। তবে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকে কিছু রূঢ় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সম্বিত ফিরে না পেলে ভবিষ্যতে যে আরো বড় মাপের বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে, সে কথাটি সর্বদা মাথায় থাকতে হবে। ভালো করে মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে এযাবত্কালে যা ঘটেছে তা হলো, প্রধানত— ক. ক্ষতির সম্ভাবনাকে আড়ালে রেখে শুধু মুনাফামুখী মনোবৃত্তি বিনিয়োগকারীকে প্রলুব্ধ করেছে; খ. অনেক বিনিয়োগকারী কোম্পানির সম্পদ ও সম্ভাবনা সম্পর্কে ধারণা দেননি; গ. নিজের চিন্তায় নয়, অন্যদের অনুসরণ করে বাজারে শেয়ার প্রবেশ করা হয়েছে; ঘ. একটা বিশেষ গোষ্ঠী কর্তৃক বাজার ও শেয়ার কারসাজি করার ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তা রোধকল্পে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা; ঙ. বাণিজ্যিক ব্যাংকের মুনাফামুখী মনোবৃত্তি ও শেয়ারবাজারে অতিরিক্ত বিনিয়োগ; চ. প্রাতিষ্ঠানিক শেয়ারের অভাব ও ছ. নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যর্থতা। বস্তুত, বাজারকে উঠিয়ে আনতে হলে ক থেকে ছ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে নবধারামূলক উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিতে হবে।

সব শেষে বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বিখ্যাত কয়েকজন ব্যক্তির দুটি উক্তি দীক্ষা হিসেবে উপহার দেয়া যায় (মনসুর ২০১২; ইন্টারনেট)।

বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ ধনী ওয়ারেন বাফেট ১১ বছর বয়স থেকে শেয়ারবাজারের সঙ্গে যুক্ত হন এবং কেনা শুরু করেন। বর্তমানে তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪৪ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (জিডিপি) অর্ধেকের কাছাকাছি। তার মতে, বাজার বিধাতার মতোই তাদের সাহায্য করে, যারা নিজেরা নিজেদের সাহায্য করে। কিন্তু যারা নিজেরা জানে না তারা কী করছে, বাজার তাদের ক্ষমা করে না (যদিও বিধাতা ক্ষমা করে থাকেন)। তিনি আরো বলেন, যে ব্যবসা বোঝা যায় না, সেখানে বিনিয়োগ না করাই ভালো। যদি শেয়ারের দাম ৫০ শতাংশ পড়ে যাওয়ার পরও আতঙ্কমুক্ত থাকা না যায়, তাহলে শেয়ারবাজারে আসা উচিত নয়।

মহান স্যার আইজ্যাক নিউটন সাউথ সি কোম্পানির শেয়ার কিনে একবার শেয়ারবাজারে বেশকিছু অর্থ হারানোর পর (২০ হাজার পাউন্ড বা বর্তমান মূল্যে প্রায় ৩ মিলিয়ন ডলার বা ২৪ কোটি টাকা) আক্ষেপের সুরে বলেছেন, আমি আকাশের তারার নড়াচড়া হিসাব করতে পারি কিন্তু মানুষের পাগলামি হিসাব করতে পারি না।

দুবার নোবেল বিজয়ী স্টিগলিটজ বলেন, শেয়ারবাজারে তথ্যপ্রবাহ অসম্পূর্ণ ও বৈষম্যমূলক থাকে বিধায় এক পক্ষ জয়ী ও অন্য পক্ষ ধরাশায়ী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আমার দেশ আমেরিকায় অনেকে আমাকে পছন্দ করে না এজন্য যে, আমি ওয়াল স্ট্রিটের ‘বড়দের’ কারসাজির বিপক্ষে এবং সাধারণ ‘ছোট’ মানুষের পক্ষে কথা বলি।

জনাথন সুইফট (যিনি গালিভার্স ট্রাভেলস লিখেছেন) শেয়ারবাজারে সব খুইয়ে বলেছেন, পৃথিবীতে অসংলগ্নতা ছাড়া অন্য কিছুই স্থির নয়।

যদি ১০ বছর কোনো শেয়ার ধরে রাখার ইচ্ছে না জাগে তাহলে এমনকি ১০ মিনিট ধরে রাখার চিন্তা করা ঠিক নয়।

সুন্দরী প্রতিযোগিতার পরিণাম

জন মেইনার্ড কেইনস শেয়ারবাজারে ফটকা আচরণ নিয়ে একটা উপমা উপস্থাপন করেছেন। তার সময়কালে কিছু খবরের কাগজ ‘সুন্দরী প্রতিযোগিতা’র আয়োজন করত। পত্রিকায় ১০০ নারীর ছবি ছাপা হতো এবং এর মধ্য থেকে পাঠককে বলা হতো পাঁচজন সুন্দরী নারীর একটি তালিকা পাঠাতে। নিয়মটা ছিল, পুরস্কার তিনি পাবেন, যার পছন্দ অন্যান্য প্রতিযোগীদের গড় পছন্দের সবচেয়ে কাছাকাছি। এ অবস্থায় একজন সরল পাঠক আগপাছ না ভেবে ‘যে দেখে সুন্দর তার চোখে’ (বিউটি লাইজ ইন দ্য আইজ অব দ্য বিহোল্ডার) সূত্র ধরে সেরা সুন্দরী শনাক্ত করে পাঁচজনের তালিকা পাঠিয়ে দিত। তবে এক্ষেত্রে কিছুটা অস্বাভাবিক কৌশলও ছিল। আর তা হচ্ছে, অন্যান্য প্রতিযোগী সুন্দরীদের নিয়ে কী ক্রম সাজাতে পারে, সেটাও প্রতিযোগীর বিবেচ্য বিষয়, তাই কাজটা দাঁড়ায় নিজের পছন্দের সঙ্গে অন্যদের পছন্দ যতটুকু সম্ভব সমন্বয় করে তালিকা প্রস্তুত করা। যে ‘অন্যদের’ কথা চিন্তা করা হচ্ছে, তারাও আবার অন্য এক ‘অন্যদের’ চিন্তায় বিভোর, যারা অন্য এক অন্যদের কথা ভাবছে। এবং এভাবেই চলতে থাকে নিজের চিন্তা পাশ কাটিয়ে অন্যদের চিন্তায় মশগুল থাকার প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার শেষে যা দাঁড়ায় তা হলো, প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পাওয়ার জন্য নিজের চোখে সত্যিকার সুন্দরী বাছাইয়ের চেয়ে অন্যের পছন্দের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়া।

একইভাবে কেইনস যুক্তি দিলেন যে, যেহেতু শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী একপর্যায়ে গিয়ে অন্যের কাছে শেয়ার বিক্রি করে থাকেন, সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোম্পানির সত্যিকার মূল্যের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে তিনি এ কোম্পানির ওপর অন্যদের সম্ভাব্য মূল্যায়ন নিয়ে মাথা ঘামান বেশি। তার মতে, সবচেয়ে দক্ষ শেয়ার বিনিয়োগকারী মানুষের মনোজাগতিক অবস্থানকে আগেভাগে বুঝতে পারেন। কেইনস বিশ্বাস করতেন যে, শেয়ার দামের নড়াচড়া প্রায়ই অবিবেচনাপ্রসূত সুখবাদ ও দুঃখবাদের ঢেউ প্রতিফলিত করে। তিনি এর নাম দিয়েছেন বিনিয়োগকারীর অ্যানিমেল স্পিরিট বা জন্তু-চেতনা।

বোকারাম খেলে যা

যদিও প্রায়োগিক পর্যবেক্ষণ দ্বারা নিশ্চিত নয়, তার পরও বলতে হয়, শেয়ারবাজার নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছে বোকারাম তত্ত্ব (গ্রেটার ফুল থিউরি)। এ তত্ত্ব মনে করে, শেয়ারবাজারে বুদ্বুদ সৃষ্টির পেছনে কাজ করে এক ধরনের উচ্চাভিলাষী বোকা খেলোয়াড়, যারা তাদের চেয়েও বড় বোকাদের কাছে বিক্রি করার প্রত্যাশায় আরো বেশি দামে শেয়ার কেনে। এ অসমর্থিত তত্ত্ব অনুসারে, বুদ্বুদ চলতে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত এই অতিমূল্যায়িত সম্পদ বিক্রির জন্য বোকা তার চেয়েও বেশি বোকার সন্ধান না পায়। বুদ্বুদ সেখানেই শেষ হবে, যখন অপেক্ষাকৃত বেশি বোকা নিজেই সবচেয়ে বড় বোকা হয়ে সবচেয়ে বেশি দাম দিয়ে কেনার মতো বোকা আর খুঁজে পাবে না।



লেখক: অধ্যাপক ও সাবেক উপাচার্য

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সংবেদনশীল তথ্য এর সর্বশেষ খবর

উপরে