ঢাকা, বুধবার, ২০ জুন ২০১৮, ৭ আষাঢ় ১৪২৫

'শেয়ার কেলেঙ্কারির হোতারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে' -মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী

২০১৮ ফেব্রুয়ারি ০৬ ১৭:২৮:১০
'শেয়ার কেলেঙ্কারির হোতারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে' -মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী

মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান : সাত বছর পার হলেও শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির হোতারা এখনও ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। কোন ভাবেই এসব হোতাদের বিচার করা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব হোতারা আবারো সামনে শেয়ার কেলেঙ্কারির আরও বড় পরিকল্পনায় উৎসাহ পাচ্ছেন বলে মনে করছেন পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী।

তার মতে, বিনিয়োগকারীদের পুঁজি হারানোর কান্না এখনও থামেনি। এখানেই শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বড় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।

একইসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের (বিবি) সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালিদের প্রকাশ করা ২০১০ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির রিপোর্ট পুরোপুরি যৌক্তিক। কারণ তিনি একজন যোগ্য ব্যক্তি। তার যোগ্যতায় তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বায়িত্বশীল পদ পেয়েছেন। সেই ধরনের পদে থাকা ব্যক্তি অযৌক্তিক রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারেন না। তারপরও যদি তিনি অযৌক্তিক রিপোর্ট প্রকাশ করেন, তবে সরকার কেন তার বিরুদ্ধে এ্যাকশন নিচ্ছে না এমন প্রশ্ন তুলেছেন মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী।

দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে সভাপতি বলেন, “২০১০ সালের কেলেঙ্কারির রিপোর্টকে বানোয়াটসহ নবম শ্রেণির পাঠ্য বইয়ের সঙ্গে তুলনা করতে চেষ্টা করছেন অনেকেই। সেটা মোটেও ঠিক হচ্ছে। এটি রীতি মতো শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির হোতাদের উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। এজন্য এখনও শেয়ারবাজারের মাঝে মাঝে বেশ ভাল ধস হচ্ছে ।”

বর্তমান সূচক পতন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চলতি বছরের শুরু থেকেই বাজারে ব্যাপক সূচক ধস হচ্ছে। এই বছরের এ পযন্ত ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স তিনশ পয়েন্ট কমেছে। গত এক মাস ৬দিনে এধরনের পতন স্বাভাবিক নয়। আবার গত বছরের গড় ৯শত কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। সেই লেনদেন গড় এই বছরের চলে এসেছে চারশত কোটি টাকার ঘরে। যা বাজারের স্বাভাবিক কাযক্রমকে বাধাগ্রস্থ্য করছে। পূর্বে শেয়ারবাজার ধসের কারণে বিনিয়োগকারীদের আত্মহত্যা প্রসঙ্গে সভাপতি বলেন, “অনেকেই ২০১০ সালে পুঁজি হারিয়ে কষ্ট ও ক্ষোভে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। এসময় হারিয়ে যাওয়া লিয়াকত, প্রতীকসহ আরো অনেক বিনিয়োগকারীর স্মৃতিচারণ করেন তিনি বলেন, আমরা পূর্বের সেই দৃশ্য আর দেখতে চাই না। তাই অবিলম্বে এসব ধস রোধে রেগুলেটরদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবার ওপরে জোর দেন তিনি।”

সম্প্রতি মুখোমুখি হন পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন স্টাফ রিপোর্টার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান। পাঠকদের জন্য সাক্ষাতকারের চুম্বক অংশ তুলে ধরা হলো-

পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদ গঠন সম্পর্কে বলুন?

মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী: ২০১০ সালের ৬ ডিসেম্বরে শেয়ারবাজারের ধস শুরু হয়। সে সময় পুঁজিহারা ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী আন্দোলনে শুরু করে। এতে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য থেকে আমরা পিছিয়ে পড়তে থাকি। এ আন্দোলনকে গঠনমূলক বাস্তব রূপ দিতে বিনিয়োগকারীদের ঐক্য করার প্রয়োজন দেখা দেয়। পরে আমরা সবাই আলোচনার মাধ্যমে, ২০১০ সালে ২২ ডিসেম্বরে একটি আহবায়ক কমিটি গঠন করি। আমাকে এ কমিটির প্রধান করা হয়। এর আট মাস পর আমরা ১০১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করি।

ঐক্য পরিষদের কী ধরনের কাজ করে থাকেন?

মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী: পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঐক্য তৈরি করাই মূল্য কাজ। এই ঐক্যের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিধি মোতাবেক সব অধিকার আদায় করে থাকে। ব্রোকারহাউজসহ শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টরা যেন বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কোন অনিয়ম না করতে পারে, সেই লক্ষ্যে গড়া এ পরিষদ।

শেয়ারবাজার তালিকাভুক্ত কোম্পানির বার্ষিক সাধারন সভায় (এজিএম) ঐক্য পরিষদের বেশ কিছু সদস্য অনৈতিকভাবে এজেন্ডা পাসের সহায়তা করছে। এসব সদস্যদের ব্যাপারে ঐক্য পরিষদ কি ব্যবস্থা নিচ্ছে?

মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী: প্রতি বছরেই শেয়ারবাজার তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর কর্তৃপক্ষ শেয়ারহোল্ডারদের নিয়ে একদিন এজিএম করে। এই এজিএমে কোম্পানিগুলো তাদের সমাপ্ত হিসাব বছরের লভাংশ প্রদান, আর্থিক পতিবেদন প্রকাশ, পরিচালক নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডাগুলো অনুমোদন করেন শেয়ারহোল্ডাররা। এটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার বেধে দেয়া নিয়ম। কিন্তু অনেকদিন ধরেই দেখছি অনেক কোম্পানির এজিএমে বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি তেমন নেই। তাই কোম্পানিগুলো ভাড়াটে লোক বিনিয়োগকারী সাজে এজিএম করে। এবং এজিএমে পূর্ব ঘোষিত এজেন্ডাগুলো অনুমোদন করছে। ওই এজিএমগুলোতে আমাদের ঐক্য পরিষদের বেশ কিছু সদস্যর আনাগোনা রয়েছে এমন অভিযোগ আছে। তাই ওই অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে ঐক্য পরিষদ বিশেষ মিটিং করেছে। এই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে যেসব ঐক্য’র সদস্যরা এজিএমে অনৈতিক এজেন্ডা পাসে সহায়তা করছে, তাদের একটি তালিকা করা। কেউ যদি প্রমানিত হয় যে, এজিএমে ওইসব অনৈতিক কাজ করেছে তবে তাকে ঐক্য পরিষদ থেকে বহিস্কার করা হবে।

আপনার দৃষ্টিতে বর্তমান শেয়ারবাজারের পরিস্থিতি কেমন?

মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী: গত বছরে শেয়ারবাজার হঠাৎ করেই লেনদেন নয়শ কোটি টাকার ঘরে, আবার সূচক ছিল ৬ হাজার পয়েন্টে ঘরে। কিন্তু হঠাৎ করেই চলতি বছরের শুরু থেকেই বাজারে ব্যাপক সূচক ধস হচ্ছে। চলতি বছরের এ পযন্ত ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স তিনশ পয়েন্ট কমেছে। গত এক মাস ৬দিনে এধরনের পতন স্বাভাবিক নয়। আবার গত বছরের গড় ৯শত কোটি টাকা থেকে কমে লেনদেন চলতি বছরের চলে এসছে চারশত কোটি টাকা ঘরে। যা বাজারের স্বাভাবিক কাযক্রমকে বাধাগ্রস্থ্য করছে।

পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ারধারণ বিষয়ে কিছু বলুন?

মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী: শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত অনেক কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালক বিএসইসি নিয়ম পতিপালন করছেন না। যেসব কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালক ব্যক্তিগতভাবে দুই শতাংশ এবং সমষ্টিগতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণ করছেন না, তাদের জরুরি ভিত্তিতে এই নিয়ম পালনে বাধ্য করা দরকার।

একই ব্যক্তি একাধিক কোম্পানির এমডি বিষয়ে কিছু বলুন।

মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী: একই ব্যক্তি একাধিক লিমিটেড কোম্পানির এমডি বিযয়টি ওই কোম্পানিগুলোর কাজের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যেখানে এক ব্যক্তি একটি কোম্পানি সামাল দিতে পারে না, সেখানে একই এমডি একাধিক কোম্পানি পরিচালন বিষয়টি চিন্তা করার মতো। এসব কোম্পানি যেন শেয়ারবাজারে অনুমোদন না পায়, সেই বিষয়ে বিএসইসিকে কঠোর হতে হবে।

আইপিও অনুমোদন প্রসঙ্গে বলুন।

মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী: বিগত সময়ের ৪৭টি কোম্পানির ২৭টি দর ইস্যুমূল্যের নিচে। এনিয়ে বিএসইসি কোনো মাথা ব্যাথা নেই। এটা বিএসইসি অবহেলার জন্য হয়েছে। তারা যদি আইপিও অনুমোদনে কঠোর হতেন, তাহলে নয়ছয় কোম্পানিগুলো অনুমোদন পেতো না।

বাইব্যাক প্রসঙ্গে কিছু বলুন?

মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী: বাইব্যাক নিয়ম থাকলে বিনিয়োগকারী আর্থিক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবে। বাইব্যাক হলো- কোনো কোম্পানির শেয়ার দর যদি ইস্যুমূল্যের নিচে নেমে আসে, তাহলে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ সেই শেয়ার ইস্যু মূল্যর চেয়ে বেশি দর দিয়ে বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে কিনে নিবে। যাতে বিনিয়োগকারী তার আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে।

কর সুবিধা পেতে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তি প্রসঙ্গে বলুন?

মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী: যে কোম্পানি নিজস্ব ফায়দা নিতে শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত হতে চায়, সেগুলো কোনভাবেই যেন শেয়ারবাজারে আসতে না পারে। কারণ বিনিয়োগকারীদের কথা না ভাবলে সেই কোম্পানির শেয়ারবাজারে আসা দরকার নেই।

বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে আপনার বক্তব্য কী?

মিজান-উর-রশিদ চৌধুরী: আপনারা দৈনিক লেনদেন পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করুন। মার্জিন লোন পরিহার করে কোম্পানির অতীত ইতিহাস যাচাই বাছাই করে বিনিয়োগ করুন। মৌলভিত্তিক কোম্পানি দেখে, বুঝেশুনে ও বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগ করুন। একইসঙ্গে গুজব বিনিয়োগ বর্জন করুন।

শেয়ার বার্তা/ জে ভি

বাজার বিশ্লেষণ এর সর্বশেষ খবর

উপরে